০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ভয়াবহ প্রাণহানির আশঙ্কা, নিহত ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে

ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা আগের ধারণার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দীর্ঘ পাঁচ দিন পর দেশটিতে সীমিত পরিসরে ফোন যোগাযোগ চালু হলে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করে। যদিও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন শুরুতে তুলনামূলক কম নিহতের হিসাব দিয়েছিল, তারা বরাবরই সতর্ক করে আসছিল যে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে জানান, তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, তবে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সময়ে তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মর্গের ভেতরের ১৬ মিনিটের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা সিবিএস নিউজ যাচাই করেছে। ভিডিওতে ৩৬৬ থেকে ৪০০টি মৃতদেহ স্তূপ করে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। ফরেনসিক কর্মীরা গুলির ক্ষত, শটগানের আঘাতসহ ভয়াবহ জখমের চিহ্ন নথিভুক্ত করতে থাকেন। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা রক্তাক্ত কাপড় ও স্বজনদের আহাজারি পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।

ইরান সরকার এখনো বিক্ষোভে নিহতদের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্স একজন অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে। ওই কর্মকর্তা সহিংসতার জন্য বিদেশি মদদপুষ্ট উসকানিকারীদের দায়ী করেন।

এর বিপরীতে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম দাবি করেছেন, দমন-পীড়নের মাত্রা কল্পনার বাইরে। তার অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের তথ্য সংগ্রহে কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, পুরো দেশটিকে যেন একটি বিশাল ‘একাকী কারাকক্ষে’ বন্দি করে রাখা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘সাহায্য আসছে’। হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য সামরিক ও গোপন কৌশল নিয়ে বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে। পেন্টাগন সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পকে প্রচলিত বিমান হামলার বাইরেও বিভিন্ন বিকল্পের কথা জানানো হয়েছে।

এদিকে নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জনগণ এখন কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দেখতে চায়। তার মতে, দ্রুত হস্তক্ষেপ হলে প্রাণহানি কমবে এবং বর্তমান শাসনের পতন ত্বরান্বিত হবে।

সব মিলিয়ে, ইরানের চলমান অস্থিরতা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

বাকেরগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ: তিনজনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিল প্রশাসন

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ভয়াবহ প্রাণহানির আশঙ্কা, নিহত ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে

Update Time : ০৯:৫৬:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা আগের ধারণার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এ পর্যন্ত ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দীর্ঘ পাঁচ দিন পর দেশটিতে সীমিত পরিসরে ফোন যোগাযোগ চালু হলে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করে। যদিও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন শুরুতে তুলনামূলক কম নিহতের হিসাব দিয়েছিল, তারা বরাবরই সতর্ক করে আসছিল যে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে জানান, তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, তবে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সময়ে তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মর্গের ভেতরের ১৬ মিনিটের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা সিবিএস নিউজ যাচাই করেছে। ভিডিওতে ৩৬৬ থেকে ৪০০টি মৃতদেহ স্তূপ করে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। ফরেনসিক কর্মীরা গুলির ক্ষত, শটগানের আঘাতসহ ভয়াবহ জখমের চিহ্ন নথিভুক্ত করতে থাকেন। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা রক্তাক্ত কাপড় ও স্বজনদের আহাজারি পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।

ইরান সরকার এখনো বিক্ষোভে নিহতদের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্স একজন অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে। ওই কর্মকর্তা সহিংসতার জন্য বিদেশি মদদপুষ্ট উসকানিকারীদের দায়ী করেন।

এর বিপরীতে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম দাবি করেছেন, দমন-পীড়নের মাত্রা কল্পনার বাইরে। তার অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের তথ্য সংগ্রহে কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, পুরো দেশটিকে যেন একটি বিশাল ‘একাকী কারাকক্ষে’ বন্দি করে রাখা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘সাহায্য আসছে’। হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য সামরিক ও গোপন কৌশল নিয়ে বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে। পেন্টাগন সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পকে প্রচলিত বিমান হামলার বাইরেও বিভিন্ন বিকল্পের কথা জানানো হয়েছে।

এদিকে নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জনগণ এখন কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দেখতে চায়। তার মতে, দ্রুত হস্তক্ষেপ হলে প্রাণহানি কমবে এবং বর্তমান শাসনের পতন ত্বরান্বিত হবে।

সব মিলিয়ে, ইরানের চলমান অস্থিরতা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে।