বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মানবেন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, দায়িত্বকালীন সময়ে একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া এবং রোগী পাঠিয়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় রোগী, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডা. মানবেন্দ্র দাস ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। তবে যোগদানের পর থেকেই তিনি মূলত বরিশাল শহরেই অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, তিনি প্রতিদিন গড়ে সকাল ১১টার দিকে কর্মস্থলে আসেন এবং দুপুর দেড়টার মধ্যেই উপজেলা ত্যাগ করেন। ফলে দুপুরের পর ইনডোর ও জরুরি বিভাগ কার্যত অভিজ্ঞ চিকিৎসকশূন্য হয়ে পড়ে।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিকেলের পর জরুরি বিভাগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে জুনিয়র চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। গুরুতর রোগী এলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দায়িত্বশীল চিকিৎসক না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
রোগীদের অভিযোগেও একই চিত্র উঠে এসেছে। এক ভুক্তভোগী রোগী বলেন, “হাসপাতালে গেলে বলা হয় ডাক্তার নেই। পরে দেখি একই ডাক্তার বরিশালের ক্লিনিকে রোগী দেখছেন।” আরেক রোগী জানান, সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে তাকে বরিশালের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. মানবেন্দ্র দাস নিয়মিত বিকেল ৩টার পর থেকে ওই ক্লিনিকে চেম্বার করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ডা. মানবেন্দ্র দাস বরিশাল শহরের একাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রোগীদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করাতে পাঠিয়ে তিনি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ করেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আসেনি, তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন চর্চা চলে আসছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে ডা. মানবেন্দ্র দাসের নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এডহক ভিত্তিতে তার নিয়োগ হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সে সময় আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসক সংগঠন স্বাচিপের প্রভাব খাটিয়ে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বড় অংকের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে, যদিও বিষয়টি কখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে যায়নি।
বরিশালের স্থানীয় বাসিন্দা পলাশ বলেন, “চাকরি নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা। সেবা দেওয়ার চেয়ে শহরকেন্দ্রিক থাকাই ছিল মূল লক্ষ্য।” এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয়রা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশে চিকিৎসকদের বিএনপি-পন্থি সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) বরিশাল জেলা শাখার এক নেতা বলেন, “প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে যদি অবৈধভাবে এডহক নিয়োগ হয়ে থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে নিয়োগ বাতিল করা উচিত। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় এমন অনিয়ম চলতে দেওয়া যায় না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মানবেন্দ্র দাস উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, “সাংবাদিক দেখলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। যত অনিয়ম আপনারা করেন, দোষ চাপান আমাদের ওপর। আমার বিষয় দেখার জন্য আমার কর্তৃপক্ষ আছে। এটা আপনাদের বিষয় না।”
এ প্রসঙ্গে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুমি আক্তার বলেন, “নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকাটা যেমন সত্য, তেমনি আবাসিক সংকটও বাস্তব। ফলে অনেকের পক্ষেই এখানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এতে সাধারণ রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”
বিষয়টি নিয়ে কড়া অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল। তিনি বলেন, “সরকারি চাকরি করতে হলে কর্মস্থলে থাকতে হবে—এটি চাকরির মৌলিক শর্ত। দায়িত্বে অবহেলা বা নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিধিমালা অনুযায়ী দায়িত্বকালীন সময়ে সরকারি চিকিৎসকের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখা বা কমিশন গ্রহণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিশেষ করে আরএমও পদের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক অন-কলে থাকা বাধ্যতামূলক।”
মোঃ জহিরুল ইসলাম 






















