বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা বহু বছর ধরে মতবিরোধ, হিংস্রতা ও বিভাজনের এক তিক্ত বাস্তবতা দেখে আসছি। জনগণ আজ আর সেই পুরোনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। মানুষ চায় শালীনতা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার রাজনীতি—যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা হবে সভ্যতার সীমার মধ্যে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী যেভাবে মির্জা আব্বাস–এর মতো দেশের একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে উদ্দেশ করে আক্রমণাত্মক ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করছেন, তা পরিবর্তনের রাজনীতির দাবি করা কোনো শক্তির কাছ থেকে মোটেই প্রত্যাশিত নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতেই পারে, তর্ক-বিতর্কও হতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বেয়াদবি কখনোই সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে না।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের প্রতিফলন। একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা যদি সত্যিই পরিবর্তনের বার্তা দিতে চায়, তাহলে তার ভাষা ও আচরণেও সেই পরিবর্তনের ছাপ থাকতে হবে। নোংরা ভাষা, ব্যক্তিগত কটাক্ষ কিংবা অসম্মানজনক মন্তব্য দিয়ে কখনোই নতুন রাজনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে না; বরং তা পুরোনো বিভক্তি ও ঘৃণার রাজনীতিকেই শক্তিশালী করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে; কিন্তু তার মধ্যেও থাকবে রাজনৈতিক সৌন্দর্য, সৌজন্য ও পারস্পরিক সম্মান। ভিন্ন মতকে সম্মান করার মধ্যেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেলে রাজনীতি কেবল সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নাগরিক পার্টি–র প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। দলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য ও আচরণ যদি সীমা অতিক্রম করে, তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা দলের নেতৃত্বেরই দায়িত্ব। সময় থাকতে লাগাম টেনে না ধরলে একটি ব্যক্তি পুরো সংগঠনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইতিহাসে একটি কথা প্রচলিত আছে—চীনের সবচেয়ে বড় দুঃখের নাম হুয়াংহো নদী। কারণ তার ভয়াবহ বন্যা বারবার ধ্বংস ডেকে এনেছে। তেমনি কোনো দলের জন্য একজন নেতার দায়িত্বহীন বক্তব্যও একসময় সেই দলের সবচেয়ে বড় দুঃখে পরিণত হতে পারে। তাই বলা যায়, সময় থাকতে যদি সতর্ক না হওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে সেই দুঃখের নামই হয়ে উঠতে পারে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী।
বাংলাদেশের মানুষ এখন ভদ্র, যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল রাজনীতি দেখতে চায়। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, দরকার নীতির লড়াই; কটূক্তি নয়, দরকার যুক্তি ও আদর্শের প্রতিযোগিতা। সত্যিকার পরিবর্তনের রাজনীতি শুরু হয় ভাষা ও আচরণের পরিবর্তন দিয়েই—এটাই সময়ের দাবি।
মোজাম্মেল হোসেন মোহন 






















