০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসন সমঝোতায় অচলাবস্থা: জামায়াত–ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে

দফায় দফায় বৈঠক হলেও জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে আসন সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনা চললেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। ফলে জামায়াতসহ ১১ দলের মধ্যে আসন বণ্টনের যে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিও স্থগিত করা হয়েছে।

আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আসন সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। কিন্তু বেলা সোয়া দুইটার দিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “অনিবার্য কারণবশত” সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।

সমঝোতা আলোচনার সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের তারিখ জানানো হবে।”

তবে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান ভিন্ন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়ে জোটগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই।

আসনসংখ্যা নিয়ে প্রধান বিরোধ
দলীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন অন্তত ৫০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে চায়। কিন্তু জামায়াত সর্বশেষ আলোচনায় ৪৫টি আসন ছাড় দিতে রাজি হয়েছে এবং বাকি ৫টি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে—যেখানে সব দল প্রার্থী দিতে পারবে।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন চায় মোট আসনের ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩০টি আসন উন্মুক্ত রাখা হোক। এ প্রস্তাবে জামায়াত রাজি হয়নি। ইসলামী আন্দোলনের ধারণা, জামায়াত যদি শেষ পর্যন্ত ১৯০টি আসনে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তবে তারাও ৬০ থেকে ৭০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা করবে।

আলাদা জোটের সম্ভাবনা
সমঝোতা ভেস্তে গেলে ইসলামী আন্দোলন আলাদা জোট গঠনের দিকেও এগোতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দলটির বিভিন্ন সূত্র থেকে। ইতিমধ্যে তারা নতুন করে আটটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
খেলাফত মজলিস
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
এবি পার্টি
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
বাংলাদেশ লেবার পার্টি

ইসলামী আন্দোলন সূত্র আরও জানিয়েছে, তারা জামায়াতকে ১৫০ আসনে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবেও রাজি করানোর চেষ্টা করবে। তেমনটি হলে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) সবাইকে নিয়ে বৃহত্তর সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গাজী আতাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি, নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। এর আগে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। আলোচনা চলমান রয়েছে।”

জামায়াতের অবস্থান
জামায়াত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলন শুধু আসনসংখ্যা নয়, সম্ভাব্য সরকার গঠিত হলে সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান কে হবেন—এ বিষয়েও আগাম নিশ্চয়তা চাচ্ছে। জামায়াত মনে করে, এসব বিষয় এখনই নির্ধারণের সময় আসেনি।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন যদি অনড় অবস্থানে থাকে, তবে তাদের ছাড়াই বাকি দলগুলোকে নিয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত করার চিন্তা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে অন্য দলগুলো কিছুটা বাড়তি আসন পেতে পারে।
তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইসলামী আন্দোলন যদি তাদের ক্ষোভ ভুলে আবার আলোচনায় ফিরতে চায়, জামায়াত শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করবে।”

অতীত প্রেক্ষাপট
গণ-অভ্যুত্থানের পর ইসলামী আন্দোলনই প্রথম ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি নিয়ে কাজ শুরু করেছিল—যেখানে সমঝোতায় থাকা ইসলামপন্থী দলগুলো একটি আসনে একজন প্রার্থী দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। শুরুতে খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এতে যুক্ত হয়, পরে জামায়াত ও আরও কয়েকটি দল যুক্ত হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টির সঙ্গে জামায়াত আলাদাভাবে বৈঠক করায় ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। আসনসংখ্যা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিল ও মজলিসে আমেলার বৈঠকেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

শেষ কথা
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগামী কয়েক দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে—তারা একসঙ্গে নির্বাচনে যাবে, নাকি ভিন্ন ভিন্ন জোট ও মেরুতে বিভক্ত হয়ে ভোটের মাঠে নামবে।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

বাকেরগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ: তিনজনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিল প্রশাসন

আসন সমঝোতায় অচলাবস্থা: জামায়াত–ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে

Update Time : ০৯:৩৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

দফায় দফায় বৈঠক হলেও জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে আসন সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনা চললেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। ফলে জামায়াতসহ ১১ দলের মধ্যে আসন বণ্টনের যে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিও স্থগিত করা হয়েছে।

আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আসন সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। কিন্তু বেলা সোয়া দুইটার দিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “অনিবার্য কারণবশত” সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।

সমঝোতা আলোচনার সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের তারিখ জানানো হবে।”

তবে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান ভিন্ন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়ে জোটগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই।

আসনসংখ্যা নিয়ে প্রধান বিরোধ
দলীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন অন্তত ৫০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে চায়। কিন্তু জামায়াত সর্বশেষ আলোচনায় ৪৫টি আসন ছাড় দিতে রাজি হয়েছে এবং বাকি ৫টি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে—যেখানে সব দল প্রার্থী দিতে পারবে।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন চায় মোট আসনের ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩০টি আসন উন্মুক্ত রাখা হোক। এ প্রস্তাবে জামায়াত রাজি হয়নি। ইসলামী আন্দোলনের ধারণা, জামায়াত যদি শেষ পর্যন্ত ১৯০টি আসনে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তবে তারাও ৬০ থেকে ৭০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা করবে।

আলাদা জোটের সম্ভাবনা
সমঝোতা ভেস্তে গেলে ইসলামী আন্দোলন আলাদা জোট গঠনের দিকেও এগোতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দলটির বিভিন্ন সূত্র থেকে। ইতিমধ্যে তারা নতুন করে আটটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
খেলাফত মজলিস
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
এবি পার্টি
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
বাংলাদেশ লেবার পার্টি

ইসলামী আন্দোলন সূত্র আরও জানিয়েছে, তারা জামায়াতকে ১৫০ আসনে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবেও রাজি করানোর চেষ্টা করবে। তেমনটি হলে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) সবাইকে নিয়ে বৃহত্তর সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গাজী আতাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি, নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। এর আগে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। আলোচনা চলমান রয়েছে।”

জামায়াতের অবস্থান
জামায়াত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলন শুধু আসনসংখ্যা নয়, সম্ভাব্য সরকার গঠিত হলে সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান কে হবেন—এ বিষয়েও আগাম নিশ্চয়তা চাচ্ছে। জামায়াত মনে করে, এসব বিষয় এখনই নির্ধারণের সময় আসেনি।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন যদি অনড় অবস্থানে থাকে, তবে তাদের ছাড়াই বাকি দলগুলোকে নিয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত করার চিন্তা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে অন্য দলগুলো কিছুটা বাড়তি আসন পেতে পারে।
তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইসলামী আন্দোলন যদি তাদের ক্ষোভ ভুলে আবার আলোচনায় ফিরতে চায়, জামায়াত শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করবে।”

অতীত প্রেক্ষাপট
গণ-অভ্যুত্থানের পর ইসলামী আন্দোলনই প্রথম ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি নিয়ে কাজ শুরু করেছিল—যেখানে সমঝোতায় থাকা ইসলামপন্থী দলগুলো একটি আসনে একজন প্রার্থী দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। শুরুতে খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এতে যুক্ত হয়, পরে জামায়াত ও আরও কয়েকটি দল যুক্ত হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টির সঙ্গে জামায়াত আলাদাভাবে বৈঠক করায় ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। আসনসংখ্যা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিল ও মজলিসে আমেলার বৈঠকেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

শেষ কথা
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগামী কয়েক দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে—তারা একসঙ্গে নির্বাচনে যাবে, নাকি ভিন্ন ভিন্ন জোট ও মেরুতে বিভক্ত হয়ে ভোটের মাঠে নামবে।