০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাড়ি ভাড়ায় নতুন সমন্বিত নির্দেশনা: ভাড়াটিয়া–বাড়িওয়ালার জন্য ১৬ দফা নীতিমালা

ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া প্রতি বছরের শুরুতে বাড়তে থাকে, কিন্তু এখন থেকে দুই বছরের আগে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যাবে না। এই নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গুলশান-২ এর নগর ভবনে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ সাংবাদিকদের বলেন, জানুয়ারি মাসে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো একটি সাধারণ প্রথা, যা বন্ধ করতে হবে। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির সময় হবে বছরের নির্দিষ্ট অর্থবছরের জুন-জুলাই।

বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষা এবং বাড়িওয়ালা–ভাড়াটিয়ার মধ্যে সুস্থ ও স্বচ্ছ সম্পর্ক নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালায় ভাড়া নির্ধারণ, নিরাপত্তা, সেবাসুবিধা, চুক্তি প্রক্রিয়া ও বিরোধ নিষ্পত্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা-
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই ভাড়া দেওয়া বাসাটি বসবাসের উপযোগী অবস্থায় রাখতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটিয়া তা বাড়িওয়ালাকে জানাবেন এবং বাড়িওয়ালা দ্রুত সমাধান করতে বাধ্য থাকবেন।

সবুজায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্ব-
বাড়ির পরিবেশ উন্নয়নে ছাদ, বারান্দা বা উন্মুক্ত স্থানে ফুল, ফল ও সবজি চাষের মাধ্যমে সবুজায়নের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তার স্বার্থে শর্তসাপেক্ষে ছাদ ও মূল গেটের চাবি প্রদান করতে হবে।

ভাড়া পরিশোধ ও রশিদ বাধ্যতামূলক-
ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে এবং বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত ভাড়ার রশিদ দিতে হবে। ভাড়াটিয়ার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়ির নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাড়াটিয়াদের মতামত গ্রহণ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

ভাড়া বৃদ্ধিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা-
নির্দেশনায় বলা হয়েছে—নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর দুই বছরের আগে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ভাড়া বৃদ্ধির সময়কাল হবে জুন–জুলাই মাস এবং উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে তা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। বার্ষিক ভাড়ার পরিমাণ কোনোভাবেই এলাকার বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

চুক্তি ও অগ্রিম ভাড়ার সীমা-
বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে ভাড়ার শর্ত, অগ্রিম জমা, ভাড়া বৃদ্ধির নিয়ম ও বাড়ি ছাড়ার সময়সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় সর্বোচ্চ ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।

ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থতা ও নোটিশ-
ভাড়াটিয়া নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিক সতর্কতা দেওয়া হবে। এরপরও ভাড়া পরিশোধ না হলে বকেয়া পরিশোধ সাপেক্ষে দুই মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করা যাবে। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে চুক্তি বাতিল করতে হলে উভয় পক্ষকে কমপক্ষে দুই মাসের নোটিশ দিতে হবে।

সমিতি গঠন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা-
সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভাড়া সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ প্রথমে সমিতির মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে। সমাধান না হলে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা যাবে।

আইন মেনে চলার আহ্বান-
ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষায় ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ এবং সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রয়োজনে জোনভিত্তিক মতবিনিময় সভার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নতুন এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং ভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা বহুলাংশে কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট: এনসিপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া সালাউদ্দীনকে গ্রেপ্তার

বাড়ি ভাড়ায় নতুন সমন্বিত নির্দেশনা: ভাড়াটিয়া–বাড়িওয়ালার জন্য ১৬ দফা নীতিমালা

Update Time : ০১:৫০:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া প্রতি বছরের শুরুতে বাড়তে থাকে, কিন্তু এখন থেকে দুই বছরের আগে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যাবে না। এই নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গুলশান-২ এর নগর ভবনে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ সাংবাদিকদের বলেন, জানুয়ারি মাসে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো একটি সাধারণ প্রথা, যা বন্ধ করতে হবে। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির সময় হবে বছরের নির্দিষ্ট অর্থবছরের জুন-জুলাই।

বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষা এবং বাড়িওয়ালা–ভাড়াটিয়ার মধ্যে সুস্থ ও স্বচ্ছ সম্পর্ক নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালায় ভাড়া নির্ধারণ, নিরাপত্তা, সেবাসুবিধা, চুক্তি প্রক্রিয়া ও বিরোধ নিষ্পত্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা-
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই ভাড়া দেওয়া বাসাটি বসবাসের উপযোগী অবস্থায় রাখতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটিয়া তা বাড়িওয়ালাকে জানাবেন এবং বাড়িওয়ালা দ্রুত সমাধান করতে বাধ্য থাকবেন।

সবুজায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্ব-
বাড়ির পরিবেশ উন্নয়নে ছাদ, বারান্দা বা উন্মুক্ত স্থানে ফুল, ফল ও সবজি চাষের মাধ্যমে সবুজায়নের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তার স্বার্থে শর্তসাপেক্ষে ছাদ ও মূল গেটের চাবি প্রদান করতে হবে।

ভাড়া পরিশোধ ও রশিদ বাধ্যতামূলক-
ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে এবং বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত ভাড়ার রশিদ দিতে হবে। ভাড়াটিয়ার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়ির নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাড়াটিয়াদের মতামত গ্রহণ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

ভাড়া বৃদ্ধিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা-
নির্দেশনায় বলা হয়েছে—নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর দুই বছরের আগে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ভাড়া বৃদ্ধির সময়কাল হবে জুন–জুলাই মাস এবং উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে তা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। বার্ষিক ভাড়ার পরিমাণ কোনোভাবেই এলাকার বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

চুক্তি ও অগ্রিম ভাড়ার সীমা-
বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে ভাড়ার শর্ত, অগ্রিম জমা, ভাড়া বৃদ্ধির নিয়ম ও বাড়ি ছাড়ার সময়সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় সর্বোচ্চ ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।

ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থতা ও নোটিশ-
ভাড়াটিয়া নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিক সতর্কতা দেওয়া হবে। এরপরও ভাড়া পরিশোধ না হলে বকেয়া পরিশোধ সাপেক্ষে দুই মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করা যাবে। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে চুক্তি বাতিল করতে হলে উভয় পক্ষকে কমপক্ষে দুই মাসের নোটিশ দিতে হবে।

সমিতি গঠন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা-
সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভাড়া সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ প্রথমে সমিতির মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে। সমাধান না হলে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা যাবে।

আইন মেনে চলার আহ্বান-
ভাড়াটিয়ার অধিকার সুরক্ষায় ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ এবং সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রয়োজনে জোনভিত্তিক মতবিনিময় সভার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নতুন এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং ভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা বহুলাংশে কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।