২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হালাল–হারাম: বিশ্বাসী জীবনের নৈতিক দিশারি ও নিরাপদ সমাজের ভিত্তি

হালাল অর্থ বৈধ ও পবিত্র, আর হারাম অর্থ অবৈধ ও নিষিদ্ধ। মানুষের সব চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা ও কার্যকলাপই হালাল ও হারামের পরিধির মধ্যে পড়ে। একজন বিশ্বাসী মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এমনকি আন্তর্জাতিক জীবনও হালাল–হারামের নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হয়। কোনটি করণীয়, কোনটি বর্জনীয়—তা নির্ধারণের মাপকাঠিই হলো হালাল ও হারাম।

হালাল–হারাম কেবল আচরণগত বিধান নয়; এটি চেতনা, মূল্যবোধ, আইন ও রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের মৌলিক ভিত্তি। ধর্মীয় জীবনের শুদ্ধতা ও ভারসাম্য এই সীমারেখার মাধ্যমেই রক্ষা পায়। এতে রয়েছে দুনিয়ার শান্তি এবং পরকালের মুক্তির নিশ্চয়তা। প্রতিটি পদে হালাল–হারামের সচেতনতা মানবাধিকারের সুরক্ষা ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থার সর্বোত্তম উপায়। ইসলামে হালাল–হারাম নির্ধারণের একমাত্র উৎস হলো ওয়াহি—অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহ।

হালাল–হারামের আলোচনায় প্রথমেই আসে খাদ্য ও পানীয়ের বিষয়। কোরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না; নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সুরা বাকারা: ১৬৮)

আরও বলেন,
“আল্লাহ তোমাদের যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দিয়েছেন, তা গ্রহণ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।” (সুরা মায়েদা: ৮৮)

এছাড়া আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
“তোমরা যুদ্ধে যা লাভ করেছ, তা হালাল ও উত্তম হিসেবে উপভোগ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা আনফাল: ৬৯)
“আল্লাহ তোমাদের হালাল ও পবিত্র যা দিয়েছেন, তা থেকে আহার করো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো।” (সুরা নাহল: ১১৪, ১১৬)

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, “হারাম দ্বারা পুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (মুসনাদে আহমাদ)
আরও বলেন, “পবিত্র বস্তুর বাইরে আল্লাহ তাআলা কিছুই গ্রহণ করেন না।” (সহিহ মুসলিম)

মানুষ জীবনে যা কিছু ভোগ বা উপভোগ করে—সবই তার রিজিক। এই রিজিক হালাল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত আবশ্যক। প্রথমত, বস্তু বা বিষয়টি নিজেই হালাল, পবিত্র ও অনুমোদিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তা অর্জনের পথ ও মাধ্যমও হতে হবে সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমরা সেই হালাল ও উত্তম রিজিক আহার করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছি।” (সুরা বাকারা: ১৭২)

হারাম বস্তু হালাল পন্থায় অর্জিত হলেও তা কখনো হালাল হয় না। আবার হালাল বস্তু যদি হারাম পথে উপার্জিত হয়, সেটিও বৈধ থাকে না। মনিব যদি শ্রমিক বা কর্মচারীর সঙ্গে জুলুম ও অবিচার করে, তবে তার সম্পদ হালাল হয় না। অনুরূপভাবে শ্রমিক যদি মনিবের সঙ্গে ফাঁকি বা প্রতারণা করে, তার উপার্জনও হালাল নয়।

ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ব্যবসায়ী যদি পণ্যে ভেজাল দেয়, ওজনে বা পরিমাণে কম দেয়, নকল পণ্য বিক্রি করে কিংবা মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়—তার উপার্জন হালাল হয় না। আবার ক্রেতাও যদি বিক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করে, তার রিজিকও হালাল থাকে না। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন,
“দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মানুষের কাছ থেকে নেওয়ার সময় পুরোটা নেয়, আর দেওয়ার সময় কম দেয়।” (সুরা মুতাফ্ফিফিন: ১–২)

অন্যদিকে, প্রিয় নবীজি (সা.) সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন,
“সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

সুতরাং হালাল–হারামের প্রতি সচেতনতা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের অংশ নয়; বরং এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং কল্যাণকর বিশ্ব গঠনের অবিচ্ছেদ্য শর্ত।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

বিশ্বকাপ জিততে ভারতকে মাঠের বাউন্ডারি বড় করার পরামর্শ

হালাল–হারাম: বিশ্বাসী জীবনের নৈতিক দিশারি ও নিরাপদ সমাজের ভিত্তি

Update Time : ০২:২৭:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

হালাল অর্থ বৈধ ও পবিত্র, আর হারাম অর্থ অবৈধ ও নিষিদ্ধ। মানুষের সব চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা ও কার্যকলাপই হালাল ও হারামের পরিধির মধ্যে পড়ে। একজন বিশ্বাসী মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এমনকি আন্তর্জাতিক জীবনও হালাল–হারামের নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হয়। কোনটি করণীয়, কোনটি বর্জনীয়—তা নির্ধারণের মাপকাঠিই হলো হালাল ও হারাম।

হালাল–হারাম কেবল আচরণগত বিধান নয়; এটি চেতনা, মূল্যবোধ, আইন ও রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের মৌলিক ভিত্তি। ধর্মীয় জীবনের শুদ্ধতা ও ভারসাম্য এই সীমারেখার মাধ্যমেই রক্ষা পায়। এতে রয়েছে দুনিয়ার শান্তি এবং পরকালের মুক্তির নিশ্চয়তা। প্রতিটি পদে হালাল–হারামের সচেতনতা মানবাধিকারের সুরক্ষা ও নিরাপদ সমাজব্যবস্থার সর্বোত্তম উপায়। ইসলামে হালাল–হারাম নির্ধারণের একমাত্র উৎস হলো ওয়াহি—অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহ।

হালাল–হারামের আলোচনায় প্রথমেই আসে খাদ্য ও পানীয়ের বিষয়। কোরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না; নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সুরা বাকারা: ১৬৮)

আরও বলেন,
“আল্লাহ তোমাদের যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দিয়েছেন, তা গ্রহণ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।” (সুরা মায়েদা: ৮৮)

এছাড়া আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
“তোমরা যুদ্ধে যা লাভ করেছ, তা হালাল ও উত্তম হিসেবে উপভোগ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা আনফাল: ৬৯)
“আল্লাহ তোমাদের হালাল ও পবিত্র যা দিয়েছেন, তা থেকে আহার করো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো।” (সুরা নাহল: ১১৪, ১১৬)

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, “হারাম দ্বারা পুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (মুসনাদে আহমাদ)
আরও বলেন, “পবিত্র বস্তুর বাইরে আল্লাহ তাআলা কিছুই গ্রহণ করেন না।” (সহিহ মুসলিম)

মানুষ জীবনে যা কিছু ভোগ বা উপভোগ করে—সবই তার রিজিক। এই রিজিক হালাল হওয়ার জন্য দুটি শর্ত আবশ্যক। প্রথমত, বস্তু বা বিষয়টি নিজেই হালাল, পবিত্র ও অনুমোদিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তা অর্জনের পথ ও মাধ্যমও হতে হবে সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমরা সেই হালাল ও উত্তম রিজিক আহার করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছি।” (সুরা বাকারা: ১৭২)

হারাম বস্তু হালাল পন্থায় অর্জিত হলেও তা কখনো হালাল হয় না। আবার হালাল বস্তু যদি হারাম পথে উপার্জিত হয়, সেটিও বৈধ থাকে না। মনিব যদি শ্রমিক বা কর্মচারীর সঙ্গে জুলুম ও অবিচার করে, তবে তার সম্পদ হালাল হয় না। অনুরূপভাবে শ্রমিক যদি মনিবের সঙ্গে ফাঁকি বা প্রতারণা করে, তার উপার্জনও হালাল নয়।

ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ব্যবসায়ী যদি পণ্যে ভেজাল দেয়, ওজনে বা পরিমাণে কম দেয়, নকল পণ্য বিক্রি করে কিংবা মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়—তার উপার্জন হালাল হয় না। আবার ক্রেতাও যদি বিক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করে, তার রিজিকও হালাল থাকে না। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন,
“দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মানুষের কাছ থেকে নেওয়ার সময় পুরোটা নেয়, আর দেওয়ার সময় কম দেয়।” (সুরা মুতাফ্ফিফিন: ১–২)

অন্যদিকে, প্রিয় নবীজি (সা.) সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন,
“সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

সুতরাং হালাল–হারামের প্রতি সচেতনতা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের অংশ নয়; বরং এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং কল্যাণকর বিশ্ব গঠনের অবিচ্ছেদ্য শর্ত।