অল্প কিছুদিন আগেও যিনি ছিলেন একটি রাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি- ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের স্ত্রী- আজ তিনি একজন বৃদ্ধা নারী, যাকে প্রকাশ্যে গ্রেফতার করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার মুখ ফুলে গেছে, শরীর আঘাতে ভরা, হাঁটার শক্তি নেই। অথচ তার সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে এমনভাবে, যা মানব ইতিহাসে দাসদের সঙ্গে দাসব্যবসায়ীরা করতো।
এখানে প্রশ্নটা আবেগের নয়, প্রশ্নটা সভ্যতার। তার অপরাধ কী?
কোন আইন, কোন নীতি, কোন তথাকথিত গণতান্ত্রিক আদর্শ এই বর্বরতাকে বৈধতা দেয়? এই ঘটনার চেয়েও ভয়ংকর বিষয়টি হলো- এর চারপাশে জমে ওঠা নিঃশব্দতা। যারা প্রতিদিন মানবাধিকার আর নারীর অধিকারের কথা বলে, যারা সুযোগ পেলেই নৈতিকতার উচ্চাসনে বসে বক্তৃতা দেয়, আজ তারা সবাই অদৃশ্য। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নেই, নারীবাদী কণ্ঠগুলো স্তব্ধ, প্রতিবাদের মঞ্চগুলো শুনশান।
এই নীরবতা কাকতালীয় নয়, এটি পরিকল্পিত। কারণ এইবার নির্যাতনকারী কোনো মুসলিম নয়, যাকে সহজেই শয়তান বানিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড় করানো যাবে। এইবার অত্যাচার করছে খোদ আমেরিকা। তাই এই সহিংসতা নাকি তুচ্ছ, বরং “বিশ্বের জন্য কল্যাণকর”।
ফলে কেউ মুখ খুলছে না—
না নাস্তিক,
না খ্রিস্টান,
না প্রগতিশীল,
না মানবাধিকার কর্মী।
নৈতিকতার মানদণ্ড এখানে ধর্ম, মানবতা বা আইন দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় ক্ষমতা দিয়ে। কাজটি যেহেতু এসেছে আঙ্কেল ট্রাম্পের দিক থেকে- এক উগ্র প্রোটেস্ট্যান্ট ক্ষমতার প্রতীক- তাই এই নির্যাতন আর অপরাধ থাকে না, হয়ে যায় কূটনীতি। এখানেই আমাদের সবচেয়ে কঠিন সত্যটির মুখোমুখি হতে হয়।
এই পৃথিবীতে কোনো স্থায়ী মিত্র নেই।
আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রুর বিপক্ষে
চীন নির্ভরযোগ্য নয়,
রাশিয়া নয়,
আমেরিকা নয়,
এমনকি পুরো পশ্চিমা বিশ্বও নয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই- আছে কেবল স্বার্থ। আজ যে হাত কাঁধে, কাল সেই হাতই গলায় চেপে ধরবে, যদি তাতে লাভ থাকে।
তাই আমাদের একমাত্র বাস্তব মিত্র হলো সেই শক্তি, যা আমরা নিজের হাতে তৈরি করি, অথবা কোনো শর্ত ছাড়াই অর্জন করি। কারণ ইতিহাস একটাই শিক্ষা দেয়- এই পৃথিবীতে দুর্বলদের কোনো সম্মান নেই।
অশ্রু দিয়ে রাষ্ট্র চলে না,
কান্নাকাটি দিয়ে আগ্রাসন থামে না,
নৈতিক বক্তৃতায় বোমা থেমে যায় না।
আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ, প্রতিবাদ, মানবিক আবেদন- সবকিছুই শক্তিহীন হলে অর্থহীন। এগুলো কেবল শক্তিশালীদের হাতের অলংকার, দুর্বলদের জন্য এগুলো সান্ত্বনার গল্প মাত্র।
পৃথিবী আমাদের সম্মান করবে কেবল তখনই, যখন আমাদের হাতে এমন শক্তি থাকবে, যে শক্তি প্রয়োজনে তার ঘরের দরজায় গিয়ে তাকে থামাতে পারে। এটাই বাস্তবতা।
এটাই আধুনিক বিশ্বের নিষ্ঠুর নিয়ম।
এবং এই সত্য অস্বীকার করার মূল্য
সবচেয়ে বেশি দিতে হয় দুর্বলদেরই।
মোজাম্মেল হোসেন মোহন 





















