১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিলা কেটে মাটি বিক্রি লোহাগাড়ায় প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পুটিবিলা ইউনিয়নে অবস্থিত ‘কালুনির বর পাহাড়’ নামের সরকারি টিলাকে ধাপে ধাপে কেটে ফেলা হচ্ছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে কেটে বিক্রি হচ্ছে টিলার মাটি। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই টিলার ২০ শতক এরই মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে।

ঘটনা শুধু একটি এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের খবর নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত, ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছপালায় আচ্ছাদিত এই টিলা ছিল স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। লোকালয় থেকে দূরে নির্জন এলাকায় থাকায় এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। সেটি হুমকির মুখে পড়ল।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-তে স্পষ্টভাবে বলা আছে, সরকারি বা বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না, যদি না জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকে। এ ক্ষেত্রে এমন কোনো ছাড়পত্রের তথ্য নেই। তবু প্রায় এক বছর ধরে ধাপে ধাপে টিলা কাটা হচ্ছে।

বাংলাদেশে পাহাড় ও টিলা কাটা নতুন ঘটনা নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অতীতে অসংখ্য পাহাড় কেটে বসতি ও স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, যার ভয়াবহ পরিণতি আমরা বারবার দেখেছি।

এ ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি। প্রায় এক বছর ধরে যদি একটি সরকারি টিলা কাটা হয়, তবে স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কীভাবে তা অজানা থাকে!

স্থানীয় এক ব্যক্তির দখল ও তত্ত্বাবধানে টিলা কাটার অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রশাসনের দায়িত্ব। তবে তদন্ত যেন কাগজে–কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত সরেজমিন অভিযান, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে কাটা অংশে পুনরায় বনায়ন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রাকৃতিক টিলা ও পাহাড় কেবল মাটির স্তূপ নয়। এগুলো জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার অবিচ্ছেদ্য উপাদান। একটি টিলা কেটে ফেলা মানে শুধু কিছু মাটি সরানো নয়, বরং একটি বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করা। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

লোহাগাড়ার ঘটনার দ্রুত ও দৃশ্যমান সমাধান হওয়া জরুরি। অন্যথায় এটি আরও অনেক এলাকায় একই ধরনের অনিয়মকে উৎসাহিত করবে। প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী দ্রুত অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সেটিই হবে প্রকৃত বার্তা। পরিবেশ রক্ষায় শূন্য সহনশীলতার নীতি কেবল ঘোষণায় নয়, প্রয়োগেও প্রতিফলিত হতে হবে।

Tag :
About Author Information

Mohon

মায়াবী চিত্রা হরিণটির পা চেপে ধরেছেন একজন, অন্যজন কোপাচ্ছেন দা দিয়ে

টিলা কেটে মাটি বিক্রি লোহাগাড়ায় প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে

Update Time : ০৯:৫২:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পুটিবিলা ইউনিয়নে অবস্থিত ‘কালুনির বর পাহাড়’ নামের সরকারি টিলাকে ধাপে ধাপে কেটে ফেলা হচ্ছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে কেটে বিক্রি হচ্ছে টিলার মাটি। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই টিলার ২০ শতক এরই মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে।

ঘটনা শুধু একটি এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের খবর নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত, ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছপালায় আচ্ছাদিত এই টিলা ছিল স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। লোকালয় থেকে দূরে নির্জন এলাকায় থাকায় এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। সেটি হুমকির মুখে পড়ল।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-তে স্পষ্টভাবে বলা আছে, সরকারি বা বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না, যদি না জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকে। এ ক্ষেত্রে এমন কোনো ছাড়পত্রের তথ্য নেই। তবু প্রায় এক বছর ধরে ধাপে ধাপে টিলা কাটা হচ্ছে।

বাংলাদেশে পাহাড় ও টিলা কাটা নতুন ঘটনা নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অতীতে অসংখ্য পাহাড় কেটে বসতি ও স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, যার ভয়াবহ পরিণতি আমরা বারবার দেখেছি।

এ ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি। প্রায় এক বছর ধরে যদি একটি সরকারি টিলা কাটা হয়, তবে স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কীভাবে তা অজানা থাকে!

স্থানীয় এক ব্যক্তির দখল ও তত্ত্বাবধানে টিলা কাটার অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রশাসনের দায়িত্ব। তবে তদন্ত যেন কাগজে–কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত সরেজমিন অভিযান, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে কাটা অংশে পুনরায় বনায়ন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রাকৃতিক টিলা ও পাহাড় কেবল মাটির স্তূপ নয়। এগুলো জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার অবিচ্ছেদ্য উপাদান। একটি টিলা কেটে ফেলা মানে শুধু কিছু মাটি সরানো নয়, বরং একটি বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করা। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

লোহাগাড়ার ঘটনার দ্রুত ও দৃশ্যমান সমাধান হওয়া জরুরি। অন্যথায় এটি আরও অনেক এলাকায় একই ধরনের অনিয়মকে উৎসাহিত করবে। প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী দ্রুত অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সেটিই হবে প্রকৃত বার্তা। পরিবেশ রক্ষায় শূন্য সহনশীলতার নীতি কেবল ঘোষণায় নয়, প্রয়োগেও প্রতিফলিত হতে হবে।