০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অন্ধকারেও মানুষকে খুঁজে পায় মশা: নিঃশ্বাস, তাপ আর গন্ধই তাদের ‘গোপন অস্ত্র’

রাতের ঘর। চারপাশে নিস্তব্ধতা, বাতি নিভে গেছে, জানালার বাইরে অন্ধকার। এমন সময় হঠাৎ কানের পাশে সেই বিরক্তিকর ভোঁ ভোঁ শব্দ—মশা। আলো না থাকলেও সে ঠিকই মানুষকে খুঁজে পায়, যেন অন্ধকারেও তার চোখে মানুষের অবস্থান স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো আলো ছাড়াই এত নিখুঁতভাবে মশা কীভাবে মানুষকে খুঁজে বের করে?

আসলে এই রহস্যের পেছনে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, আছে জটিল কিন্তু অত্যন্ত নিখুঁত এক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক সময় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলেজি এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা যৌথভাবে গবেষণায় উঠে এসেছে, মশা মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করতে একাধিক সংবেদনশীল সংকেত ব্যবহার করে, যা অন্ধকারেও কার্যকর।

মানুষ যখন শ্বাস নেয়, তখন নিঃশ্বাসের সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশে যায়। মশা এই গ্যাসের প্রতি অবিশ্বাস্যভাবে সংবেদনশীল। বাতাসে সামান্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তনও তারা দূর থেকেই শনাক্ত করতে পারে। এই গ্যাসই তাদের কাছে প্রথম সংকেত কোথাও একজন জীবন্ত প্রাণী আছে। ধীরে ধীরে সেই গ্যাসের ঘনত্ব অনুসরণ করেই তারা এগিয়ে আসে লক্ষ্যবস্তুর দিকে।

কিন্তু শুধু নিঃশ্বাসই নয়, মশা আরও একটি শক্তিশালী সংকেত ব্যবহার করে শরীরের তাপ। মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই উষ্ণ, আর সেই উষ্ণতাকে মশা বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারে। এই ক্ষমতাকে বলা হয় ইনফ্রারেড সেন্সিংয়ের মতো আচরণ। অন্ধকারে কোনো দৃশ্যমান আলো না থাকলেও, তারা তাপের উৎসকে ‘অনুভব’ করতে পারে। ফলে ঘুমন্ত মানুষের শরীর তাদের কাছে একটি স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

এর পাশাপাশি রয়েছে আরও সূক্ষ্ম একটি বিষয় মানুষের শরীরের গন্ধ। আমাদের ত্বক থেকে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, যেমন ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোর অনুপাত ও ঘনত্ব ব্যক্তিভেদে আলাদা। মশা এই গন্ধকে এক ধরনের ‘রাসায়নিক পরিচয়’ হিসেবে ব্যবহার করে। তাই দেখা যায়, একই ঘরে কয়েকজন মানুষ থাকলেও মশা নির্দিষ্ট একজনের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়। সেই ব্যক্তির শরীরের রাসায়নিক সংকেত তাদের কাছে বেশি ‘আকর্ষণীয়’ মনে হয়।

এই কারণেই অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে সব মানুষকে কি মশা সমানভাবে কামড়ায়? বাস্তবে উত্তর হলো না। কারো শরীরের ঘাম, গন্ধ, ত্বকের ব্যাকটেরিয়া বা এমনকি নিঃশ্বাসের ধরনও মশার আকর্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে কেউ কেউ রাতভর মশার আক্রমণের শিকার হন, আবার কেউ প্রায় অক্ষত থাকেন।

অনেকে মনে করেন, মশারা দলবদ্ধভাবে শিকার খোঁজে বা একে অন্যকে অনুসরণ করে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, এই ধারণা সঠিক নয়। প্রতিটি মশা আলাদাভাবে নিজের সেন্সর ব্যবহার করে মানুষকে খুঁজে বের করে। তারা একসঙ্গে কোনো নির্দেশনা অনুসরণ করে না বরং একই উৎস মানুষের শরীর তাদের সবাইকে একই জায়গায় টেনে আনে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মশার এই সক্রিয়তা রাতের বেলাতেই বেশি দেখা যায়। কারণ তাদের শরীরে একটি জৈবিক ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক কাজ করে, যা তাদের রাতের দিকে বেশি সক্রিয় করে তোলে। পাশাপাশি রাতে পরিবেশ শান্ত থাকে, বাতাস কম চলাচল করে এবং মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে ফলে প্রতিরোধ কমে যায়। সব মিলিয়ে রাত হয়ে ওঠে মশার জন্য সবচেয়ে সহজ শিকার ধরার সময়।

অর্থাৎ, অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, মশার জন্য মানুষ কখনোই ‘অদৃশ্য’ নয়। নিঃশ্বাসের গ্যাস, শরীরের উষ্ণতা আর ত্বকের রাসায়নিক গন্ধ এই তিনটি মিলেই তৈরি হয় এক অদৃশ্য নির্দেশিকা, যা মশাকে ঠিক পৌঁছে দেয় মানুষের শরীরের কাছে। অন্ধকারে আমরা যাকে অদৃশ্য ভাবি, মশার কাছে সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষ্য।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

সংগঠনকে ত্বরান্বিত করতে ৮ নং নলুয়া ইউনিয়ন বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

অন্ধকারেও মানুষকে খুঁজে পায় মশা: নিঃশ্বাস, তাপ আর গন্ধই তাদের ‘গোপন অস্ত্র’

Update Time : ১০:১৫:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

রাতের ঘর। চারপাশে নিস্তব্ধতা, বাতি নিভে গেছে, জানালার বাইরে অন্ধকার। এমন সময় হঠাৎ কানের পাশে সেই বিরক্তিকর ভোঁ ভোঁ শব্দ—মশা। আলো না থাকলেও সে ঠিকই মানুষকে খুঁজে পায়, যেন অন্ধকারেও তার চোখে মানুষের অবস্থান স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো আলো ছাড়াই এত নিখুঁতভাবে মশা কীভাবে মানুষকে খুঁজে বের করে?

আসলে এই রহস্যের পেছনে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, আছে জটিল কিন্তু অত্যন্ত নিখুঁত এক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক সময় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলেজি এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা যৌথভাবে গবেষণায় উঠে এসেছে, মশা মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করতে একাধিক সংবেদনশীল সংকেত ব্যবহার করে, যা অন্ধকারেও কার্যকর।

মানুষ যখন শ্বাস নেয়, তখন নিঃশ্বাসের সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশে যায়। মশা এই গ্যাসের প্রতি অবিশ্বাস্যভাবে সংবেদনশীল। বাতাসে সামান্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তনও তারা দূর থেকেই শনাক্ত করতে পারে। এই গ্যাসই তাদের কাছে প্রথম সংকেত কোথাও একজন জীবন্ত প্রাণী আছে। ধীরে ধীরে সেই গ্যাসের ঘনত্ব অনুসরণ করেই তারা এগিয়ে আসে লক্ষ্যবস্তুর দিকে।

কিন্তু শুধু নিঃশ্বাসই নয়, মশা আরও একটি শক্তিশালী সংকেত ব্যবহার করে শরীরের তাপ। মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই উষ্ণ, আর সেই উষ্ণতাকে মশা বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারে। এই ক্ষমতাকে বলা হয় ইনফ্রারেড সেন্সিংয়ের মতো আচরণ। অন্ধকারে কোনো দৃশ্যমান আলো না থাকলেও, তারা তাপের উৎসকে ‘অনুভব’ করতে পারে। ফলে ঘুমন্ত মানুষের শরীর তাদের কাছে একটি স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

এর পাশাপাশি রয়েছে আরও সূক্ষ্ম একটি বিষয় মানুষের শরীরের গন্ধ। আমাদের ত্বক থেকে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, যেমন ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোর অনুপাত ও ঘনত্ব ব্যক্তিভেদে আলাদা। মশা এই গন্ধকে এক ধরনের ‘রাসায়নিক পরিচয়’ হিসেবে ব্যবহার করে। তাই দেখা যায়, একই ঘরে কয়েকজন মানুষ থাকলেও মশা নির্দিষ্ট একজনের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়। সেই ব্যক্তির শরীরের রাসায়নিক সংকেত তাদের কাছে বেশি ‘আকর্ষণীয়’ মনে হয়।

এই কারণেই অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে সব মানুষকে কি মশা সমানভাবে কামড়ায়? বাস্তবে উত্তর হলো না। কারো শরীরের ঘাম, গন্ধ, ত্বকের ব্যাকটেরিয়া বা এমনকি নিঃশ্বাসের ধরনও মশার আকর্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে কেউ কেউ রাতভর মশার আক্রমণের শিকার হন, আবার কেউ প্রায় অক্ষত থাকেন।

অনেকে মনে করেন, মশারা দলবদ্ধভাবে শিকার খোঁজে বা একে অন্যকে অনুসরণ করে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, এই ধারণা সঠিক নয়। প্রতিটি মশা আলাদাভাবে নিজের সেন্সর ব্যবহার করে মানুষকে খুঁজে বের করে। তারা একসঙ্গে কোনো নির্দেশনা অনুসরণ করে না বরং একই উৎস মানুষের শরীর তাদের সবাইকে একই জায়গায় টেনে আনে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মশার এই সক্রিয়তা রাতের বেলাতেই বেশি দেখা যায়। কারণ তাদের শরীরে একটি জৈবিক ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক কাজ করে, যা তাদের রাতের দিকে বেশি সক্রিয় করে তোলে। পাশাপাশি রাতে পরিবেশ শান্ত থাকে, বাতাস কম চলাচল করে এবং মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে ফলে প্রতিরোধ কমে যায়। সব মিলিয়ে রাত হয়ে ওঠে মশার জন্য সবচেয়ে সহজ শিকার ধরার সময়।

অর্থাৎ, অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, মশার জন্য মানুষ কখনোই ‘অদৃশ্য’ নয়। নিঃশ্বাসের গ্যাস, শরীরের উষ্ণতা আর ত্বকের রাসায়নিক গন্ধ এই তিনটি মিলেই তৈরি হয় এক অদৃশ্য নির্দেশিকা, যা মশাকে ঠিক পৌঁছে দেয় মানুষের শরীরের কাছে। অন্ধকারে আমরা যাকে অদৃশ্য ভাবি, মশার কাছে সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষ্য।