৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের হাতে ৮৩ সেবা: জনগণ কি পাচ্ছে ন্যায্য সুবিধা?

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের সবচেয়ে কাছের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হলো ইউনিয়ন পরিষদ। আর এই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় সাধারণ মানুষের নানামুখী সেবা কার্যক্রম। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা থেকে শুরু করে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, ত্রাণ বিতরণ, জন্মনিবন্ধন, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা—সব মিলিয়ে চেয়ারম্যানের হাত দিয়েই জনগণের কাছে পৌঁছায় অন্তত ৮৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সেবা।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এসব সেবা কি প্রকৃত উপকারভোগীরা সঠিকভাবে পাচ্ছেন, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ?

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যাপক প্রভাব

ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ, হতদরিদ্র সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, শিশু সহায়তাসহ নানা ধরনের ভাতা ও সহায়তা বিতরণ করা হয়।

অনেক এলাকায় অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে গেলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন কিংবা রাজনৈতিক অনুসারীরা এসব তালিকায় জায়গা পান।

উন্নয়ন প্রকল্পেও প্রশ্ন

গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট, ড্রেন, বাজার উন্নয়ন, খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপন, স্যানিটারি ল্যাট্রিন বিতরণ, পানি নিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ সহায়তার মতো উন্নয়নমূলক কাজও চেয়ারম্যানের তদারকিতে বাস্তবায়ন হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক প্রকল্প কাগজে-কলমে শেষ হলেও বাস্তবে নিম্নমানের কাজ কিংবা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্কুল মেরামত, উপবৃত্তি সহযোগিতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ক্ষমতায়ন, টিকাদান, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, পুষ্টি কর্মসূচি ও কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাতে চেয়ারম্যান সক্রিয় হলে গ্রামীণ জনজীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কৃষি ও কর্মসংস্থানে বড় সুযোগ

বীজ বিতরণ, সার সহায়তা, সেচ সুবিধা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সহায়তা, ১০০ দিনের কর্মসূচি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, দরিদ্রদের কর্মসংস্থান, যুব উন্নয়ন ও শ্রমিক নিয়োগ প্রকল্পের মতো কর্মসূচিও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত শ্রমিকের বদলে প্রভাবশালীদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয় অনেক সময়।

নাগরিক সেবার কেন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ

জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, অনলাইন সেবা এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কার্যক্রমও চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।

অনেক নাগরিকের অভিযোগ, কিছু এলাকায় এসব সেবা পেতে হয়রানি, অতিরিক্ত ফি আদায় ও দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হতে হয়।

জনগণের প্রশ্ন—জবাবদিহি কোথায়?

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের হাতে বিপুল ক্ষমতা ও দায়িত্ব থাকলেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনগণ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু তদারকি, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

শেষ কথা

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান চাইলে একটি ইউনিয়নের চেহারা বদলে দিতে পারেন। আবার অনিয়ম করলে জনগণের অধিকারও হরণ হতে পারে। তাই জনগণের প্রশ্ন এখন একটাই—চেয়ারম্যানের হাতে থাকা ৮৩ সেবা কি জনগণের ঘরে পৌঁছাচ্ছে, নাকি মাঝপথেই হারিয়ে যাচ্ছে?

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

বাকেরগঞ্জের গারুড়িয়ায় ঝড়ের তাণ্ডবে বসতবাড়ি বিধ্বস্ত- খোলা আকাশের নিচে পরিবার

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের হাতে ৮৩ সেবা: জনগণ কি পাচ্ছে ন্যায্য সুবিধা?

Update Time : ১০:৪৫:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের সবচেয়ে কাছের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হলো ইউনিয়ন পরিষদ। আর এই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় সাধারণ মানুষের নানামুখী সেবা কার্যক্রম। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা থেকে শুরু করে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, ত্রাণ বিতরণ, জন্মনিবন্ধন, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা—সব মিলিয়ে চেয়ারম্যানের হাত দিয়েই জনগণের কাছে পৌঁছায় অন্তত ৮৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সেবা।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এসব সেবা কি প্রকৃত উপকারভোগীরা সঠিকভাবে পাচ্ছেন, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ?

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যাপক প্রভাব

ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ, হতদরিদ্র সহায়তা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, শিশু সহায়তাসহ নানা ধরনের ভাতা ও সহায়তা বিতরণ করা হয়।

অনেক এলাকায় অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে গেলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন কিংবা রাজনৈতিক অনুসারীরা এসব তালিকায় জায়গা পান।

উন্নয়ন প্রকল্পেও প্রশ্ন

গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট, ড্রেন, বাজার উন্নয়ন, খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ, টিউবওয়েল স্থাপন, স্যানিটারি ল্যাট্রিন বিতরণ, পানি নিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ সহায়তার মতো উন্নয়নমূলক কাজও চেয়ারম্যানের তদারকিতে বাস্তবায়ন হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক প্রকল্প কাগজে-কলমে শেষ হলেও বাস্তবে নিম্নমানের কাজ কিংবা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্কুল মেরামত, উপবৃত্তি সহযোগিতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ক্ষমতায়ন, টিকাদান, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, পুষ্টি কর্মসূচি ও কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাতে চেয়ারম্যান সক্রিয় হলে গ্রামীণ জনজীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কৃষি ও কর্মসংস্থানে বড় সুযোগ

বীজ বিতরণ, সার সহায়তা, সেচ সুবিধা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সহায়তা, ১০০ দিনের কর্মসূচি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, দরিদ্রদের কর্মসংস্থান, যুব উন্নয়ন ও শ্রমিক নিয়োগ প্রকল্পের মতো কর্মসূচিও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত শ্রমিকের বদলে প্রভাবশালীদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয় অনেক সময়।

নাগরিক সেবার কেন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ

জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, অনলাইন সেবা এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কার্যক্রমও চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।

অনেক নাগরিকের অভিযোগ, কিছু এলাকায় এসব সেবা পেতে হয়রানি, অতিরিক্ত ফি আদায় ও দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হতে হয়।

জনগণের প্রশ্ন—জবাবদিহি কোথায়?

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের হাতে বিপুল ক্ষমতা ও দায়িত্ব থাকলেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনগণ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু তদারকি, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

শেষ কথা

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান চাইলে একটি ইউনিয়নের চেহারা বদলে দিতে পারেন। আবার অনিয়ম করলে জনগণের অধিকারও হরণ হতে পারে। তাই জনগণের প্রশ্ন এখন একটাই—চেয়ারম্যানের হাতে থাকা ৮৩ সেবা কি জনগণের ঘরে পৌঁছাচ্ছে, নাকি মাঝপথেই হারিয়ে যাচ্ছে?