০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চোখের আলো নিভলেও নেভেনি জীবনের আলো, দৃষ্টিহীন দুই সহোদরের অদম্য সংগ্রাম

কিশোর বয়সেই সুজন আহমদ (৩০) ও রাজন আহমদ (২৫)-এর জীবনে নেমে আসে অমানিশা। ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে তাঁদের চোখের আলো। চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার—সবই হয়েছে; কিন্তু দৃষ্টিশক্তি আর ফেরেনি। এর মধ্যেই মারা যান তাঁদের বাবা। সংসারে রয়ে যান মা ও সাত ভাই। বড় ভাই আলাদা হয়ে গেলে পরিবারের ভার এসে পড়ে এই দুই দৃষ্টিহীন সহোদরের কাঁধে।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে জীবিকার সন্ধানে নামেন সুজন ও রাজন। দিনমজুরি, হাকালুকি হাওরের মাছ ধরা, শাকসবজি কেনা-বেচা—যে কাজই পান, সেটাই করেন। দৈনিক ৪০০–৫০০ টাকা আয় করেই কোনোমতে টেনেটুনে চলে তাঁদের সংসার। চোখে না দেখতে পারলেও মনের দৃঢ়তায় তাঁরা কখনো হার মানেননি।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের পূর্ব বেলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবদুল খালেকের দুই ছেলে সুজন ও রাজন। প্রতিদিন উপজেলা সদরের ডাকঘর সড়কের পাশে অস্থায়ী বাজারে শিম, ক্ষীরা, ধনেপাতা বিক্রি করতে দেখা যায় তাঁদের। কনকনে শীতে গায়ে চাদর জড়িয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন। ওজন মাপা আর টাকা গোনায় পাশে থাকা দোকানিরাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

একসময় মাথা গোঁজার ঠাঁইও ছিল না তাঁদের। গ্রামের আলফাজ আলী আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজ বাড়িতে। পরে বাবা আবদুল খালেক দিনমজুরির টাকা জমিয়ে ১৫ শতক জমি কিনে ঘর তোলেন। কিন্তু ২০২২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আবারও জীবনের ভারী বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়।

সুজন পড়াশোনা করতে পারেননি। রাজন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। বাবার জীবদ্দশাতেই প্রথমে সুজন, পরে রাজনের চোখে সমস্যা দেখা দেয়। মৌলভীবাজার শহরের মাতারকাপন চক্ষু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হলেও ভাগ্য ফেরেনি।

রাজন বলেন, “চোখের আলো নাই, কিন্তু মনের আলো আছে। সংসার চলা লাগে। যে কাম পাই, তাই করি। এখন ছোট ভাই জাইদুলও কাম করে। এইভাবেই দিন চলে।”

সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়েনি। দেড় বছর আগে সুজনের বিয়ে হয়েছে, পাঁচ মাস বয়সী একটি সন্তানও আছে। এর মধ্যেই বড় বিপদ—প্রায় চার লাখ টাকা ধার করে চতুর্থ ভাই হোসাইনকে কাতারে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে সে কাজ পায়নি; দালাল প্রতারণা করে উধাও। এখন হোসাইন না পারছে দেশে ফিরতে, না পারছে বিদেশে টিকে থাকতে। ধার করা টাকা শোধের চিন্তায় দিন কাটছে সুজন ও রাজনের।

ডাকঘর সড়ক এলাকার ব্যবসায়ী ইলিয়াছুর রহমান ময়না বলেন, “সুজন ও রাজন পরিশ্রমী আর সাহসী। ওরা প্রমাণ করেছে—ইচ্ছাশক্তি থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো বাধা হতে পারে না।”

চোখের আলো নিভে গেলেও জীবনযুদ্ধে থেমে থাকেননি সুজন ও রাজন। সীমাহীন কষ্টের মাঝেও তাঁদের অদম্য মনোবল আজও আলো ছড়াচ্ছে মানবিকতার পথে।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

রাজশাহীকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে বাকেরগঞ্জের মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

চোখের আলো নিভলেও নেভেনি জীবনের আলো, দৃষ্টিহীন দুই সহোদরের অদম্য সংগ্রাম

Update Time : ০৯:৪৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

কিশোর বয়সেই সুজন আহমদ (৩০) ও রাজন আহমদ (২৫)-এর জীবনে নেমে আসে অমানিশা। ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে তাঁদের চোখের আলো। চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার—সবই হয়েছে; কিন্তু দৃষ্টিশক্তি আর ফেরেনি। এর মধ্যেই মারা যান তাঁদের বাবা। সংসারে রয়ে যান মা ও সাত ভাই। বড় ভাই আলাদা হয়ে গেলে পরিবারের ভার এসে পড়ে এই দুই দৃষ্টিহীন সহোদরের কাঁধে।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে জীবিকার সন্ধানে নামেন সুজন ও রাজন। দিনমজুরি, হাকালুকি হাওরের মাছ ধরা, শাকসবজি কেনা-বেচা—যে কাজই পান, সেটাই করেন। দৈনিক ৪০০–৫০০ টাকা আয় করেই কোনোমতে টেনেটুনে চলে তাঁদের সংসার। চোখে না দেখতে পারলেও মনের দৃঢ়তায় তাঁরা কখনো হার মানেননি।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের পূর্ব বেলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবদুল খালেকের দুই ছেলে সুজন ও রাজন। প্রতিদিন উপজেলা সদরের ডাকঘর সড়কের পাশে অস্থায়ী বাজারে শিম, ক্ষীরা, ধনেপাতা বিক্রি করতে দেখা যায় তাঁদের। কনকনে শীতে গায়ে চাদর জড়িয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন। ওজন মাপা আর টাকা গোনায় পাশে থাকা দোকানিরাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

একসময় মাথা গোঁজার ঠাঁইও ছিল না তাঁদের। গ্রামের আলফাজ আলী আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজ বাড়িতে। পরে বাবা আবদুল খালেক দিনমজুরির টাকা জমিয়ে ১৫ শতক জমি কিনে ঘর তোলেন। কিন্তু ২০২২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আবারও জীবনের ভারী বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়।

সুজন পড়াশোনা করতে পারেননি। রাজন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। বাবার জীবদ্দশাতেই প্রথমে সুজন, পরে রাজনের চোখে সমস্যা দেখা দেয়। মৌলভীবাজার শহরের মাতারকাপন চক্ষু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হলেও ভাগ্য ফেরেনি।

রাজন বলেন, “চোখের আলো নাই, কিন্তু মনের আলো আছে। সংসার চলা লাগে। যে কাম পাই, তাই করি। এখন ছোট ভাই জাইদুলও কাম করে। এইভাবেই দিন চলে।”

সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়েনি। দেড় বছর আগে সুজনের বিয়ে হয়েছে, পাঁচ মাস বয়সী একটি সন্তানও আছে। এর মধ্যেই বড় বিপদ—প্রায় চার লাখ টাকা ধার করে চতুর্থ ভাই হোসাইনকে কাতারে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে সে কাজ পায়নি; দালাল প্রতারণা করে উধাও। এখন হোসাইন না পারছে দেশে ফিরতে, না পারছে বিদেশে টিকে থাকতে। ধার করা টাকা শোধের চিন্তায় দিন কাটছে সুজন ও রাজনের।

ডাকঘর সড়ক এলাকার ব্যবসায়ী ইলিয়াছুর রহমান ময়না বলেন, “সুজন ও রাজন পরিশ্রমী আর সাহসী। ওরা প্রমাণ করেছে—ইচ্ছাশক্তি থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো বাধা হতে পারে না।”

চোখের আলো নিভে গেলেও জীবনযুদ্ধে থেমে থাকেননি সুজন ও রাজন। সীমাহীন কষ্টের মাঝেও তাঁদের অদম্য মনোবল আজও আলো ছড়াচ্ছে মানবিকতার পথে।