৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি দূতকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলো দক্ষিণ আফ্রিকা

কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত ইসরায়েলি দূতকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিভাগ (ডিআইআরসিও) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে, ইসরায়েলি দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অ্যারিয়েল সেইডম্যানকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে দেশ ত্যাগ করতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার এই কঠোর পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলও সে দেশে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক শন এডওয়ার্ড বাইনোভেল্টকে পাল্টা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে একই সময়সীমার মধ্যে ইসরায়েল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ফলে প্রিটোরিয়া ও তেল আবিবের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, অ্যারিয়েল সেইডম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ‘আক্রমণাত্মক আচরণ’ করেছেন, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানের জন্য অবমাননাকর।

এছাড়া তিনি ইসরায়েলি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের বিষয়ে প্রটোকল অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ডিআইআরসিও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধার গুরুতর অপব্যবহার এবং ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। এই ধারাবাহিক আচরণ দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য আস্থা ও প্রটোকলকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষিণ আফ্রিকার এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে ফিলিস্তিনে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত শন এডওয়ার্ড বাইনোভেল্টকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। বাইনোভেল্ট মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার কার্যালয় থেকে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের মতে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তাদের দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থানের ওপর নতুন করে আঘাত হেনেছে।

বর্তমানে দুই দেশের এই কূটনৈতিক সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপস না করার ঘোষণা দিলেও, ইসরায়েল বিষয়টিকে তাদের প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার ‘পক্ষপাতমূলক বৈরিতা’ হিসেবে দেখছে।

নির্দিষ্ট ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই উভয় দেশের কূটনীতিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার পর অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। এই বহিষ্কারাদেশ কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোনো দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত সংঘাতের এক বহিঃপ্রকাশ।

সূত্র: রয়টার্স

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

সিলেটে সারজিস আলমকে বহনকারী গাড়িতে হামলা, ভেঙে গেছে পেছনের কাচ

ইসরায়েলি দূতকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলো দক্ষিণ আফ্রিকা

Update Time : ০১:৫২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

কূটনৈতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত ইসরায়েলি দূতকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বিভাগ (ডিআইআরসিও) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে, ইসরায়েলি দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অ্যারিয়েল সেইডম্যানকে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে দেশ ত্যাগ করতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার এই কঠোর পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলও সে দেশে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক শন এডওয়ার্ড বাইনোভেল্টকে পাল্টা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে একই সময়সীমার মধ্যে ইসরায়েল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ফলে প্রিটোরিয়া ও তেল আবিবের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, অ্যারিয়েল সেইডম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ‘আক্রমণাত্মক আচরণ’ করেছেন, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানের জন্য অবমাননাকর।

এছাড়া তিনি ইসরায়েলি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের বিষয়ে প্রটোকল অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ডিআইআরসিও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধার গুরুতর অপব্যবহার এবং ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। এই ধারাবাহিক আচরণ দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য আস্থা ও প্রটোকলকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষিণ আফ্রিকার এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে ফিলিস্তিনে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত শন এডওয়ার্ড বাইনোভেল্টকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। বাইনোভেল্ট মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় অবস্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার কার্যালয় থেকে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের মতে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তাদের দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থানের ওপর নতুন করে আঘাত হেনেছে।

বর্তমানে দুই দেশের এই কূটনৈতিক সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপস না করার ঘোষণা দিলেও, ইসরায়েল বিষয়টিকে তাদের প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার ‘পক্ষপাতমূলক বৈরিতা’ হিসেবে দেখছে।

নির্দিষ্ট ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই উভয় দেশের কূটনীতিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার পর অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। এই বহিষ্কারাদেশ কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোনো দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত সংঘাতের এক বহিঃপ্রকাশ।

সূত্র: রয়টার্স