৩০ মে ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব: তমদ্দুন মজলিশের হাত ধরে সংগঠিত প্রতিরোধ

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের সূচনা ঘটে। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে শিক্ষিত বাঙালি সমাজে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক উন্মাদনায় মুসলিম লীগ নেতৃত্ব তখন এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কার্যত নীরব থাকায় ভাষা প্রশ্নে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

২৯ জুলাই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ধর্মনির্বিশেষে বাঙালির শিক্ষার বাহন অবশ্যই বাংলা হওয়া উচিত। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা, আদালত ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে যুক্তি উপস্থাপন করেন।

এরও আগে ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে আবুল হাশিম মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালে গণ আজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগ তাদের ইশতেহারে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম ও আদালতের ভাষা করার প্রস্তাব দিলেও সরকারি সমর্থকদের বাধা এবং মুসলিম ছাত্রলীগের বিরোধিতায় উদ্যোগগুলো কার্যকর রূপ পায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশ’। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষকের উদ্যোগে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কুসংস্কারমুক্ত ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিশ রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দ্রুত জনমত গঠনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংগঠনটির মুখপত্র হিসেবে ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সৈনিক।

প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ প্রকাশ করে ঐতিহাসিক পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’। এতে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন সতর্ক করে বলেন, বলপ্রয়োগে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যর্থ হবে। একই পুস্তিকায় সম্পাদক ও প্রগতিশীল মুসলিম লীগ নেতা আবুল মনসুর আহমদ উল্লেখ করেন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাতারাতি সরকারি চাকরির অযোগ্য হয়ে পড়বে—যা ভাষা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার বাস্তব আশঙ্কা তৈরি করে।

পুস্তিকায় অধ্যাপক আবুল কাশেম প্রস্তাব দেন, পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা, আদালত ও দাপ্তরিক ভাষা হবে বাংলা এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা ও উর্দু—দুটি। ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তমদ্দুন মজলিশ শুধু লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ফজলুল হক হলে আয়োজিত সাহিত্যসভায় হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও কবি জসীমউদ্দীনসহ বিশিষ্টজনেরা বাংলার পক্ষে মত দেন। এর ধারাবাহিকতায় অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁঞাকে আহ্বায়ক করে রশিদ বিল্ডিংয়ে গঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

ডিসেম্বর মাসে করাচি শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ৬ ডিসেম্বর অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রথম প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সচিবালয় অভিমুখে মিছিল এবং ১২ ডিসেম্বর কর্মচারীদের ধর্মঘটে আন্দোলন বিস্তৃত হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে।

১৯৪৮ সালের শুরুতে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ঢাকা সফরে এলে তমদ্দুন মজলিশ ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানিঅর্ডার ফর্ম ও পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষার তালিকা থেকে বাংলা বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ জানান। এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের একপর্যায়ে মন্ত্রী বিষয়টিকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে উল্লেখ করেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, তমদ্দুন মজলিশের তাত্ত্বিক অবস্থান, পুস্তিকা প্রকাশ এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পথ সুগম করে।

তথ্যসূত্র: বদরুদ্দীন উমর; এমএইচ মোহন, বশীর আল হেলাল; এম.এ. বার্ণিক।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

বাকেরগঞ্জের গারুড়িয়ায় ঝড়ের তাণ্ডবে বসতবাড়ি বিধ্বস্ত- খোলা আকাশের নিচে পরিবার

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব: তমদ্দুন মজলিশের হাত ধরে সংগঠিত প্রতিরোধ

Update Time : ১২:৪২:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের সূচনা ঘটে। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে শিক্ষিত বাঙালি সমাজে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক উন্মাদনায় মুসলিম লীগ নেতৃত্ব তখন এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কার্যত নীরব থাকায় ভাষা প্রশ্নে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

২৯ জুলাই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ধর্মনির্বিশেষে বাঙালির শিক্ষার বাহন অবশ্যই বাংলা হওয়া উচিত। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা, আদালত ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে যুক্তি উপস্থাপন করেন।

এরও আগে ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে আবুল হাশিম মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালে গণ আজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগ তাদের ইশতেহারে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম ও আদালতের ভাষা করার প্রস্তাব দিলেও সরকারি সমর্থকদের বাধা এবং মুসলিম ছাত্রলীগের বিরোধিতায় উদ্যোগগুলো কার্যকর রূপ পায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশ’। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষকের উদ্যোগে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কুসংস্কারমুক্ত ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিশ রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দ্রুত জনমত গঠনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংগঠনটির মুখপত্র হিসেবে ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সৈনিক।

প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ প্রকাশ করে ঐতিহাসিক পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’। এতে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন সতর্ক করে বলেন, বলপ্রয়োগে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যর্থ হবে। একই পুস্তিকায় সম্পাদক ও প্রগতিশীল মুসলিম লীগ নেতা আবুল মনসুর আহমদ উল্লেখ করেন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাতারাতি সরকারি চাকরির অযোগ্য হয়ে পড়বে—যা ভাষা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার বাস্তব আশঙ্কা তৈরি করে।

পুস্তিকায় অধ্যাপক আবুল কাশেম প্রস্তাব দেন, পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা, আদালত ও দাপ্তরিক ভাষা হবে বাংলা এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা ও উর্দু—দুটি। ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তমদ্দুন মজলিশ শুধু লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ফজলুল হক হলে আয়োজিত সাহিত্যসভায় হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও কবি জসীমউদ্দীনসহ বিশিষ্টজনেরা বাংলার পক্ষে মত দেন। এর ধারাবাহিকতায় অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁঞাকে আহ্বায়ক করে রশিদ বিল্ডিংয়ে গঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

ডিসেম্বর মাসে করাচি শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ৬ ডিসেম্বর অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রথম প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সচিবালয় অভিমুখে মিছিল এবং ১২ ডিসেম্বর কর্মচারীদের ধর্মঘটে আন্দোলন বিস্তৃত হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে।

১৯৪৮ সালের শুরুতে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ঢাকা সফরে এলে তমদ্দুন মজলিশ ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানিঅর্ডার ফর্ম ও পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষার তালিকা থেকে বাংলা বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ জানান। এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের একপর্যায়ে মন্ত্রী বিষয়টিকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে উল্লেখ করেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, তমদ্দুন মজলিশের তাত্ত্বিক অবস্থান, পুস্তিকা প্রকাশ এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি নির্মিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পথ সুগম করে।

তথ্যসূত্র: বদরুদ্দীন উমর; এমএইচ মোহন, বশীর আল হেলাল; এম.এ. বার্ণিক।