৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবাদ প্রকাশের পর কৌশল বদল: রাতে মাটি কাটার মহোৎসব, ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সংঘর্ষ-বাকেরগঞ্জে ভূমিদস্যু নিমাই কীর্তনীয়ার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নের বাগদিয়া ঢাপরকাঠী ও সাদীশ আমতলী এলাকায় পাণ্ডব নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে মাটি বিক্রির অভিযোগে আলোচিত হয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য ফ্রন্টের বাকেরগঞ্জ উপজেলা সভাপতি নিমাই কীর্তনীয়া। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কৌশল বদলে এখন দিনের পরিবর্তে গভীর রাতে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভেকু (এক্সকাভেটর) ব্যবহার করে ফসলি জমি, নদীর পাড় এবং খাস জমি কেটে সেই মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছে। কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এ অবৈধ কার্যক্রম চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা আফরোজকে ফোন করা হলে তিনি “দেখছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি” বলে আশ্বাস দিয়ে ফোন কেটে দেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। প্রশাসনের এই নীরবতা নিয়ে এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, আগে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই মাটি কাটা হতো। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর নজরদারি বাড়ার আশঙ্কায় এখন মূলত রাতের আঁধারেই মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। মাটি কাটা বন্ধের জন্য ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

এদিকে গত রোববার গভীর রাতে কলসকাঠী বাজারে একটি দখল সূত্রে মালিকানাধীন অফিস ঘরে মাটি বিক্রির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে চক্রের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সূত্র জানায়, সেখানে নিমাই কীর্তনীয়া ১৩ লাখ টাকার হিসাব দিলে অন্য সদস্যরা ২৫ লাখ টাকা লাভ হয়েছে দাবি করেন। এ সময় নিমাই বিভিন্ন জায়গায় খরচের হিসাব দেখালেও নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারায় চক্রের সদস্যদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।

মাটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “নিমাই ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ভেকু এনে মাসিক চুক্তিতে কাজ করাচ্ছে। আমরা কয়েকজন তার সঙ্গে আছি। তার খরচের খাতা অনেক বড়—কাকে কোথায় টাকা দেয় আমরা ঠিক জানি না। শুধু ভাউচার দেখায়।”

তিনি আরও দাবি করেন, নিমাই কীর্তনীয়ার বিরুদ্ধে গরু চুরি, গাছ কাটা, সরকারি খাল ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ এবং প্রায় ৬০ একর খাস জমি দখল করে তরমুজ প্রকল্প চালুর মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

রাতে মাটি কাটার বিষয়ে ওই ব্যক্তি বলেন, “সংবাদ প্রকাশের পর কিছু ঝামেলা হয়েছে। তাই এখন দিনে কাজ করলে সমস্যা হয়, এজন্য পরামর্শ করেই রাতে মাটি কাটছি। রাতে ঝামেলা কম।”

পাণ্ডব নদীর তীর কেটে মাটি বিক্রি এবং এর ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাকেরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তন্ময় হালদার বলেন, “মাটি কাটার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে এবং খোঁজ নিয়ে জেনেছি। আজকেও যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আমাকে জানান, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে সামাজিক সংগঠন গর্বের বাকেরগঞ্জ–এর সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন মোহন বলেন, “সরকারি জায়গা ও নদীর মাটি অবৈধভাবে কাটা দীর্ঘদিন ধরে বাকেরগঞ্জে চলছে। এ বিষয়ে আমরা বহুবার প্রশাসনকে তথ্য দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝে লোক দেখানো মোবাইল কোর্ট হলেও প্রকৃতপক্ষে মাটি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোপনে আঁতাতের অভিযোগ রয়েছে।”

এদিকে অবৈধভাবে নদীর পাড় ও ফসলি জমি কাটার কারণে পরিবেশের ক্ষতি এবং স্থানীয়দের চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তারা দ্রুত এই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

বাকেরগঞ্জে ট্রাক থামিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংবাদ প্রকাশের পর কৌশল বদল: রাতে মাটি কাটার মহোৎসব, ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সংঘর্ষ-বাকেরগঞ্জে ভূমিদস্যু নিমাই কীর্তনীয়ার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

Update Time : ১০:১৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নের বাগদিয়া ঢাপরকাঠী ও সাদীশ আমতলী এলাকায় পাণ্ডব নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে মাটি বিক্রির অভিযোগে আলোচিত হয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য ফ্রন্টের বাকেরগঞ্জ উপজেলা সভাপতি নিমাই কীর্তনীয়া। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কৌশল বদলে এখন দিনের পরিবর্তে গভীর রাতে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভেকু (এক্সকাভেটর) ব্যবহার করে ফসলি জমি, নদীর পাড় এবং খাস জমি কেটে সেই মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছে। কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এ অবৈধ কার্যক্রম চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা আফরোজকে ফোন করা হলে তিনি “দেখছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি” বলে আশ্বাস দিয়ে ফোন কেটে দেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। প্রশাসনের এই নীরবতা নিয়ে এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, আগে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই মাটি কাটা হতো। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর নজরদারি বাড়ার আশঙ্কায় এখন মূলত রাতের আঁধারেই মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। মাটি কাটা বন্ধের জন্য ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

এদিকে গত রোববার গভীর রাতে কলসকাঠী বাজারে একটি দখল সূত্রে মালিকানাধীন অফিস ঘরে মাটি বিক্রির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে চক্রের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সূত্র জানায়, সেখানে নিমাই কীর্তনীয়া ১৩ লাখ টাকার হিসাব দিলে অন্য সদস্যরা ২৫ লাখ টাকা লাভ হয়েছে দাবি করেন। এ সময় নিমাই বিভিন্ন জায়গায় খরচের হিসাব দেখালেও নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারায় চক্রের সদস্যদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।

মাটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “নিমাই ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ভেকু এনে মাসিক চুক্তিতে কাজ করাচ্ছে। আমরা কয়েকজন তার সঙ্গে আছি। তার খরচের খাতা অনেক বড়—কাকে কোথায় টাকা দেয় আমরা ঠিক জানি না। শুধু ভাউচার দেখায়।”

তিনি আরও দাবি করেন, নিমাই কীর্তনীয়ার বিরুদ্ধে গরু চুরি, গাছ কাটা, সরকারি খাল ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ এবং প্রায় ৬০ একর খাস জমি দখল করে তরমুজ প্রকল্প চালুর মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

রাতে মাটি কাটার বিষয়ে ওই ব্যক্তি বলেন, “সংবাদ প্রকাশের পর কিছু ঝামেলা হয়েছে। তাই এখন দিনে কাজ করলে সমস্যা হয়, এজন্য পরামর্শ করেই রাতে মাটি কাটছি। রাতে ঝামেলা কম।”

পাণ্ডব নদীর তীর কেটে মাটি বিক্রি এবং এর ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাকেরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তন্ময় হালদার বলেন, “মাটি কাটার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে এবং খোঁজ নিয়ে জেনেছি। আজকেও যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আমাকে জানান, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে সামাজিক সংগঠন গর্বের বাকেরগঞ্জ–এর সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন মোহন বলেন, “সরকারি জায়গা ও নদীর মাটি অবৈধভাবে কাটা দীর্ঘদিন ধরে বাকেরগঞ্জে চলছে। এ বিষয়ে আমরা বহুবার প্রশাসনকে তথ্য দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝে লোক দেখানো মোবাইল কোর্ট হলেও প্রকৃতপক্ষে মাটি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোপনে আঁতাতের অভিযোগ রয়েছে।”

এদিকে অবৈধভাবে নদীর পাড় ও ফসলি জমি কাটার কারণে পরিবেশের ক্ষতি এবং স্থানীয়দের চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তারা দ্রুত এই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।