অর্থ সংকট ও দীর্ঘসূত্রতায় থমকে আছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার বহুল প্রত্যাশিত প্রকল্প। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো যাত্রী। বিশেষ করে মাদারীপুর অংশের ৪৭ কিলোমিটার সড়ক এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত ছয় মাসে এই অংশে অন্তত ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন। সরু সড়ক, যানবাহনের চাপ এবং অব্যবস্থাপনাকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। সরকারের এককভাবে এ অর্থ জোগান দেওয়া কঠিন হওয়ায় বিদেশি দাতা সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এখনো কোনো দাতা সংস্থা এগিয়ে না আসায় প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে।
তিনি আরও জানান, আপাতত ২৪ ফুট থেকে ৩২ ফুটে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সেটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সড়ক বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে এই মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৩২ হাজারে। অথচ, মাদারীপুর অংশের সড়কের প্রস্থ মাত্র ২৪ ফুট, যেখানে ফরিদপুর ও বরিশাল অংশে তা ৩২ ফুট।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সরু সড়ক ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেই সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করতে পারছেন না যাত্রীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহাসড়কে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মাহিন্দ্র ও নসিমনের মতো ধীরগতির যানবাহনের দৌরাত্ম্য।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ভাঙ্গা-মাদারীপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক সম্প্রসারণের প্রস্তাব নেওয়া হয় এবং একই বছর ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়। ২০২৩ সালে মাদারীপুর অংশের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২৫৮ কোটি টাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকিব মুন্সী বলেন, “অন্যান্য এলাকার তুলনায় মাদারীপুর অংশ খুবই সরু। পাশে মাটি না থাকায় যান চলাচলে সমস্যা হয়, প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।”
ট্রাকচালক আমির হোসেন বলেন, “এই সড়কে গাড়ি চালানো খুবই কষ্টসাধ্য। ধীরগতির যানবাহনের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করে আলাদা লেন করা হলে দুর্ঘটনা কমবে।”
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, “এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্প্রসারণ না হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত দূর করে কাজ শুরু করা জরুরি।”
মাদারীপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্সি মাসুদুর রহমান জানান, “সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জেলা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে টেকেরহাট থেকে ৬ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি অংশ করা হবে।” তবে ছয় লেন প্রকল্প কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ) জুয়েল আহমেদ বলেন, “সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনা কমবে বলে আশা করছি।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ককে নিরাপদ করা হোক, যাতে প্রতিদিনের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত থেকে মুক্তি পান সাধারণ মানুষ।
মোঃ জহিরুল ইসলাম 



















