০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘মেজর জেনারেল’ সেজে শাসাতেন পুলিশকে, ধরা পড়লেন যেভাবে

নাম মো. অপু। বয়স ৩৩ বছর। পেশায় গাড়িচালক। হরদম ফোন দিতেন পুলিশের কর্মকর্তাদের। কখনো কোনো মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে বলতেন। কখনো–বা মামলার আসামিদের রিমান্ডে নিতে তাগাদা দিতেন। কিংবা আসামিরা জামিন চাইলে, সেটা তাঁকে জানাতে এবং মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে বলতেন।

এসব কাজ করার সময় অপু নিজেকে একজন ‘মেজর জেনারেল’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এখন পুলিশ বলেছে, ‘ভুয়া পরিচয়’ দিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতেন অপু।

অপু ধরা পড়েছেন, মামলাও হয়েছে। তিন দিনের রিমান্ডে ছিলেন। পুলিশের তদন্তে অপুর এমন ভুয়া পরিচয় দিয়ে অভিনব প্রতারণার বিষয়টি উঠে এসেছে। রিমান্ড শেষে ১৪ মে অপুকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

রিমান্ড শেষে আদালতে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় নিজের দায়ের করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে তিনি সেনা কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে থানা–পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশনেও ফোন দিতেন।

মামলার বাদী অপুর কথা ও আচরণে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত ৫–এর বিচারকের সন্দেহ হয়। ১১ মে আদালত তাঁকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং মুঠোফোন তল্লাশির মৌখিক নির্দেশ দেন। তল্লাশির সময় অপুর মুঠোফোনে ‘মেজর জেনারেল মোহা. মোরশেদ’ নামে একটি সক্রিয় হোয়াটসঅ্যাপ আইডি পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় ভুয়া এই পরিচয় ব্যবহার করতেন তিনি।

তাৎক্ষণিকভাবে অপুকে আটক করা হয়। পরে তাঁর নামে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয় রাজধানীর কোতোয়ালি থানায়। মামলার বাদী যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, অপু তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে ওই ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ আইডি চালাচ্ছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক ইমরান হোসেন বলেন, আসামি অপুকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভুয়া পরিচয় দিয়ে তদবিরের পেছনে কোনো চক্র জড়িত কিনা, সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অপুর গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মেদী আশুলাইয়ে। বর্তমানে তিনি ঢাকার ভাষানটেক থানাধীন মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকার সাগরিকা খানবাড়িতে থাকেন।

যাত্রাবাড়ী থানায় ‘ভুয়া’ মামলা

পারিবারিক বিরোধের জেরে অপু তাঁর প্রথম স্ত্রী জেরিন আক্তারের নামে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় জেরিন গ্রেপ্তার হন। পরে জামিন পান।

এরপর অপু এ বছরের এপ্রিলে জেরিন আক্তার ও তাঁর শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন স্বজনসহ সাতজনের নামে যাত্রাবাড়ী থানায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন। পুলিশ শুরুতে মামলাটি নিতে চায়নি। ওই সময় যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফোন দেন অপু।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবদুল করিম বলেন, মামলায় উল্লেখ করা ঘটনাটি সত্য নয়। পুলিশ শুরুতে মামলা নিতে চায়নি। পরে ‘মেজর জেনারেল’ পরিচয়ে বারবার ফোন পেয়ে মামলা নেওয়া হয়।

মামলা নিতে চাপ

এসআই আবদুল করিম জানান, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অপু কয়েকজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। বিদেশে পাঠাতে না পারায় সেই টাকা ফেরতও দিচ্ছিলেন না। টাকা উদ্ধারের জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি পাওনাদারেরা অপুকে আটকে রাখেন।

ঘটনাটির মাস দুয়েক পর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করতে চান অপু। এরপর ‘মেজর জেনারেল’ পরিচয় দিয়ে বারবার ফোন দেওয়া হয় থানায়। মামলা নিতে ও আসামিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিতে বলা হয়। এরপর আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হলে বিচারক জামিন ও রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেন, বলছিলেন আবদুল করিম।

এ ঘটনায় অপু ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এডিসি নাসির আহম্মেদকেও ফোন দিয়েছিলেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করা হয়েছিল। সেখানে একজন মেজর জেনারেলের নাম–ছবি ছিল। ওই পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছিল, মামলার আসামিরা জামিন আবেদন করলে তাঁকে যেন জানানো হয়।

নাসির আহম্মেদ বলেন, ‘আমাকে দুদিন ফোন দিয়েছিল। একদিন মেজর জেনারেলের ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফোন দেওয়া হয়। আরেক দিন ওই সেনা কর্মকর্তার গাড়িচালক পরিচয়ে ভিন্ন একটি নম্বর থেকে ফোন আসে।’

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

সংগঠনকে ত্বরান্বিত করতে ৮ নং নলুয়া ইউনিয়ন বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

‘মেজর জেনারেল’ সেজে শাসাতেন পুলিশকে, ধরা পড়লেন যেভাবে

Update Time : ০৩:১০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

নাম মো. অপু। বয়স ৩৩ বছর। পেশায় গাড়িচালক। হরদম ফোন দিতেন পুলিশের কর্মকর্তাদের। কখনো কোনো মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে বলতেন। কখনো–বা মামলার আসামিদের রিমান্ডে নিতে তাগাদা দিতেন। কিংবা আসামিরা জামিন চাইলে, সেটা তাঁকে জানাতে এবং মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে বলতেন।

এসব কাজ করার সময় অপু নিজেকে একজন ‘মেজর জেনারেল’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এখন পুলিশ বলেছে, ‘ভুয়া পরিচয়’ দিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতেন অপু।

অপু ধরা পড়েছেন, মামলাও হয়েছে। তিন দিনের রিমান্ডে ছিলেন। পুলিশের তদন্তে অপুর এমন ভুয়া পরিচয় দিয়ে অভিনব প্রতারণার বিষয়টি উঠে এসেছে। রিমান্ড শেষে ১৪ মে অপুকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

রিমান্ড শেষে আদালতে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় নিজের দায়ের করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে তিনি সেনা কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে থানা–পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশনেও ফোন দিতেন।

মামলার বাদী অপুর কথা ও আচরণে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত ৫–এর বিচারকের সন্দেহ হয়। ১১ মে আদালত তাঁকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং মুঠোফোন তল্লাশির মৌখিক নির্দেশ দেন। তল্লাশির সময় অপুর মুঠোফোনে ‘মেজর জেনারেল মোহা. মোরশেদ’ নামে একটি সক্রিয় হোয়াটসঅ্যাপ আইডি পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় ভুয়া এই পরিচয় ব্যবহার করতেন তিনি।

তাৎক্ষণিকভাবে অপুকে আটক করা হয়। পরে তাঁর নামে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয় রাজধানীর কোতোয়ালি থানায়। মামলার বাদী যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, অপু তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে ওই ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ আইডি চালাচ্ছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক ইমরান হোসেন বলেন, আসামি অপুকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভুয়া পরিচয় দিয়ে তদবিরের পেছনে কোনো চক্র জড়িত কিনা, সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অপুর গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মেদী আশুলাইয়ে। বর্তমানে তিনি ঢাকার ভাষানটেক থানাধীন মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকার সাগরিকা খানবাড়িতে থাকেন।

যাত্রাবাড়ী থানায় ‘ভুয়া’ মামলা

পারিবারিক বিরোধের জেরে অপু তাঁর প্রথম স্ত্রী জেরিন আক্তারের নামে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় জেরিন গ্রেপ্তার হন। পরে জামিন পান।

এরপর অপু এ বছরের এপ্রিলে জেরিন আক্তার ও তাঁর শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন স্বজনসহ সাতজনের নামে যাত্রাবাড়ী থানায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন। পুলিশ শুরুতে মামলাটি নিতে চায়নি। ওই সময় যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফোন দেন অপু।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবদুল করিম বলেন, মামলায় উল্লেখ করা ঘটনাটি সত্য নয়। পুলিশ শুরুতে মামলা নিতে চায়নি। পরে ‘মেজর জেনারেল’ পরিচয়ে বারবার ফোন পেয়ে মামলা নেওয়া হয়।

মামলা নিতে চাপ

এসআই আবদুল করিম জানান, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অপু কয়েকজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। বিদেশে পাঠাতে না পারায় সেই টাকা ফেরতও দিচ্ছিলেন না। টাকা উদ্ধারের জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি পাওনাদারেরা অপুকে আটকে রাখেন।

ঘটনাটির মাস দুয়েক পর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করতে চান অপু। এরপর ‘মেজর জেনারেল’ পরিচয় দিয়ে বারবার ফোন দেওয়া হয় থানায়। মামলা নিতে ও আসামিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিতে বলা হয়। এরপর আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হলে বিচারক জামিন ও রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেন, বলছিলেন আবদুল করিম।

এ ঘটনায় অপু ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এডিসি নাসির আহম্মেদকেও ফোন দিয়েছিলেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করা হয়েছিল। সেখানে একজন মেজর জেনারেলের নাম–ছবি ছিল। ওই পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছিল, মামলার আসামিরা জামিন আবেদন করলে তাঁকে যেন জানানো হয়।

নাসির আহম্মেদ বলেন, ‘আমাকে দুদিন ফোন দিয়েছিল। একদিন মেজর জেনারেলের ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফোন দেওয়া হয়। আরেক দিন ওই সেনা কর্মকর্তার গাড়িচালক পরিচয়ে ভিন্ন একটি নম্বর থেকে ফোন আসে।’