৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে বাকবিতণ্ডা, বাবা-মা’র হাতেই খুন হয় স্কুলছাত্রী

খুলনায় বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হত্যার ঘটনায় তার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মারধরের ঘটনায় মেয়েটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

নিহত নির্জনা খুলনা সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান শনিবার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের সামনে বস্তাবন্দি অবস্থায় নির্জনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর পুলিশ বাদী হয়ে খুলনা সদর থানায় হত্যা মামলা করে।

পুলিশ জানায়, তদন্তের অংশ হিসেবে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। শুক্রবার তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। খুলনা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিম তার জবানবন্দি রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পুলিশ কমিশনার জানান, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আরিফা ইয়াসমিন সিমা বলেছেন, অবাধ্যতার কারণে ঘটনার দিন বিকেলে মেয়ের সঙ্গে মা সিমার প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তিনি মেয়েকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন। ঘরের ভেতর শোরগোল শুনে তাদের চুপ করতে আসেন নির্জনার নেশাগ্রস্ত বাবা আলীম হোসেন আকাশ। কিন্তু মেয়ে চুপ না করে আর্তচিৎকার করতে থাকায় বাবা একটি কাঠের চলা (লাকড়ি) দিয়ে নির্জনার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মেয়েটি আবারও চিৎকার করে উঠলে বাবা তার মুখ চেপে ধরেন এবং ঘটনাস্থলেই নির্জনার মৃত্যু হয়।

এই আকস্মিক ঘটনায় তারা হতচকিত হয়ে পড়েন এবং ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে নির্জনার লাশ ঘরের ভেতরে থাকা ছেঁড়া লুঙ্গি ও প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মোটরবাইকে করে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের সামনে ফেলে আসেন।

পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে আরিফা ইয়াসমিন সিমা দাবি করেছেন, নির্জনার একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং সেই পারিবারিক কলহের জেরেই এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, নির্জনার বাবা-মা দুজনই মাদকাসক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত নির্জনার বাবা আলিম হোসেন আকাশ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার এম এম শাকিলুজ্জামান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমান, অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

২৭২ রানেই অলআউট বাংলাদেশ, ওয়ারিক্যানের ৫ উইকেট

একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে বাকবিতণ্ডা, বাবা-মা’র হাতেই খুন হয় স্কুলছাত্রী

Update Time : ০৪:০৬:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

খুলনায় বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হত্যার ঘটনায় তার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মারধরের ঘটনায় মেয়েটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

নিহত নির্জনা খুলনা সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান শনিবার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের সামনে বস্তাবন্দি অবস্থায় নির্জনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর পুলিশ বাদী হয়ে খুলনা সদর থানায় হত্যা মামলা করে।

পুলিশ জানায়, তদন্তের অংশ হিসেবে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। শুক্রবার তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। খুলনা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিম তার জবানবন্দি রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পুলিশ কমিশনার জানান, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আরিফা ইয়াসমিন সিমা বলেছেন, অবাধ্যতার কারণে ঘটনার দিন বিকেলে মেয়ের সঙ্গে মা সিমার প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তিনি মেয়েকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন। ঘরের ভেতর শোরগোল শুনে তাদের চুপ করতে আসেন নির্জনার নেশাগ্রস্ত বাবা আলীম হোসেন আকাশ। কিন্তু মেয়ে চুপ না করে আর্তচিৎকার করতে থাকায় বাবা একটি কাঠের চলা (লাকড়ি) দিয়ে নির্জনার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মেয়েটি আবারও চিৎকার করে উঠলে বাবা তার মুখ চেপে ধরেন এবং ঘটনাস্থলেই নির্জনার মৃত্যু হয়।

এই আকস্মিক ঘটনায় তারা হতচকিত হয়ে পড়েন এবং ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে নির্জনার লাশ ঘরের ভেতরে থাকা ছেঁড়া লুঙ্গি ও প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মোটরবাইকে করে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের সামনে ফেলে আসেন।

পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে আরিফা ইয়াসমিন সিমা দাবি করেছেন, নির্জনার একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং সেই পারিবারিক কলহের জেরেই এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, নির্জনার বাবা-মা দুজনই মাদকাসক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত নির্জনার বাবা আলিম হোসেন আকাশ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার এম এম শাকিলুজ্জামান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমান, অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।