ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতার উদ্যোগ নিতে গিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ এ সমঝোতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ইতিমধ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা পদত্যাগ করেছেন, আবার ৩০ জন নেতা দলীয় প্রধানের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন—সব মিলিয়ে এনসিপির ভেতরে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় দল ছাড়ার ঘোষণা দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য তাসনিম জারা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেন জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হক।
৩০ নেতার স্মারকলিপি
গতকাল সন্ধ্যায় এনসিপির ৩০ জন নেতা দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-এর কাছে ‘সম্ভাব্য জোট বিষয়ে নীতিগত আপত্তি’ জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থান দুর্বল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে কর্মী-সমর্থক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি হবে এবং এনসিপির মধ্যপন্থী রাজনৈতিক এজেন্সি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নেতারা আহ্বায়ককে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “কৌশলগত কারণে নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। জামায়াতের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা হোক।”
স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাদিয়া ফারজানা দিনা, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আল ফয়সাল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সদস্য তাওহীদ তানজীম ও সৈয়দা নীলিমা দোলাসহ আরও অনেকে।
বিএনপির সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ, জামায়াতের দিকে ঝোঁক ‘মধ্যপন্থী রাজনীতি’র স্লোগান নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। নির্বাচনী আলোচনা শুরুর পর গত অক্টোবর থেকে দলটি প্রথমে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার চেষ্টা করে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হলেও চাওয়া–পাওয়ার সমন্বয় না হওয়ায় সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
এরপর বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে আলাদা মধ্যপন্থী জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এনসিপি, এবি পার্টি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে গত ৭ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’। তবে ভোটের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে এনসিপি আবার বড় দলের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটে। বিএনপির সম্ভাবনা কমে গেলে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয় দলটি। এতে সদ্য গঠিত ত্রিদলীয় জোটও ভাঙনের মুখে পড়ে।
সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত
এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতা জানিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত শুক্রবার রাতেও ঢাকায় দুই দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়, যেখানে আসন বণ্টন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন,
“সংস্কার বাস্তবায়নকে প্রধান গুরুত্ব দিয়ে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক প্রশ্ন, করণীয় ও সম্ভাব্য আসনবিন্যাস নিয়ে কথা হচ্ছে।”
৩০ আসন নিয়ে দরকষাকষি
দলীয় সূত্র জানায়, এনসিপি প্রথমে জামায়াতের কাছে ৫০টি আসন চায়। জামায়াত ৩০টি আসনে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আলোচনার পর এনসিপি তা মেনে নিয়ে সম্ভাব্য ৩০ জন প্রার্থীর একটি খসড়া তালিকাও তৈরি করে।
সমঝোতা চূড়ান্ত হলে সম্ভাব্যভাবে—
ঢাকা-১১: নাহিদ ইসলাম
রংপুর-৪: আখতার হোসেন
কুমিল্লা-৪: হাসনাত আবদুল্লাহ
পঞ্চগড়-১: সারজিস আলম
ঢাকা-১৬: আরিফুল ইসলাম আদীব
ঢাকা-১৮: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
নোয়াখালী-৬: আবদুল হান্নান মাসউদ
এ ছাড়া ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার নামও ছিল, তবে তিনি দল ছাড়ায় সেই হিসাব বদলে গেছে। আসিফের নাম আলোচনায়, মাহফুজ অনিশ্চিত
এনসিপির একটি সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এনসিপিতে যোগদান নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি ঢাকা-১০ ও কুমিল্লা-৩ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতায় তাঁর নামও প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
তবে সদ্য পদত্যাগ করা উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নির্বাচন করবেন কি না বা কোন অবস্থান নেবেন—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, গত ১০ ডিসেম্বর এনসিপি ১২৫টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। তবে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হলে নির্ধারিত ৩০টির বাইরে অন্য আসনগুলোতে এনসিপি আর প্রার্থী দেবে না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে এনসিপির ভেতরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাচনী কৌশলকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
ডেস্ক রিপোর্টঃ 



















