জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রিন্সেস টিনা খানের কন্যা রিমু রোজা খন্দকারের জীবন যেন আলো থেকে অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। শৈশবেই মায়ের মৃত্যু, বাবার অনুপস্থিতি, সামাজিক অবহেলা, প্রতারণা ও একের পর এক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন একা—নিরাপত্তাহীন ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
শৈশবে নিভে যায় আলো:
১৯৮৯ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান প্রিন্সেস টিনা খান। মৃত্যুর আগে মেয়ের জন্য চকলেট কিনে কপালে চুমু দিয়ে বিদায় নেওয়াই ছিল তাদের শেষ স্মৃতি। মায়ের মৃত্যুর পর সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাবা বিদেশে চলে যান এবং পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন রিমু।
পরবর্তীতে ঠাঁই হয় টাঙ্গাইলের ভারতেরশ্বরী হোমসে। সেখানেই কাটে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। ঈদের দিনে নতুন জামা না থাকায় শিক্ষকের দেওয়া একটি লাল স্কার্টেই কাটাতে হয় উৎসব।
সম্পর্কের নামে মানসিক নির্যাতন:
ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর নিজের কাজিন ভাইয়ের সঙ্গে আট বছরের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পড়াশোনায় সহযোগিতার অজুহাতে অভিভাবক সেজে চলতে থাকে মানসিক নিয়ন্ত্রণ। একপর্যায়ে জানা যায়, ওই ব্যক্তি ইতোমধ্যে অন্য নারীকে বিয়ে করেছেন। তবুও অর্থ ও যোগাযোগের মাধ্যমে আবেগে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা চলতে থাকে। পরে রিমু বুঝতে পারেন, এটি ভালোবাসা নয়—ব্যবহার।
জীবিকার সন্ধানে হয়রানি:
জীবনের প্রয়োজনে ১ হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন রিমু। পরে বায়িং হাউস ও টেক্সটাইল কোম্পানিতে পিএস হিসেবে কাজ করেন। তবে এক বেলজিয়ান বায়ারের অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি হারাতে হয় তাঁকে।
পাইলট হওয়ার স্বপ্নে কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ নিলেও সেখানেও নোংরা প্রস্তাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হন। এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দামী পোশাক উপহার দিয়ে অফিসে একা ডেকে নিয়ে হেনস্তার চেষ্টা করলে কোনোভাবে পালিয়ে রক্ষা পান তিনি।
মিডিয়াতেও নিরাপত্তাহীনতা:
মামা আক্তারুজ্জামানের মাধ্যমে মিডিয়াতে যাত্রা শুরু হলেও ‘হাস্কি’ কণ্ঠস্বরের কারণে নায়িকা হিসেবে সুযোগ সীমিত ছিল। তবুও ‘এফএনএফ’ ও ‘আরমান ভাই’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পান। এখানেও ভালো কাজের বিনিময়ে ‘কোয়ালিটি টাইম’-এর প্রস্তাব বাস্তবতার অংশ ছিল বলে জানান তিনি।
প্রতারণায় সর্বস্বান্ত:
বিদেশে যাওয়ার আশায় এক প্রতারকের হাতে তুলে দেন সাত লাখ টাকা এবং মায়ের দেওয়া ১৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। প্রতারক সব নিয়ে গা ঢাকা দেয়। এতে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়েন রিমু।
ভয়ংকর আশঙ্কা:
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রিমু রোজা খন্দকার জানান, এই অভিজ্ঞতা প্রকাশের পর নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। তাঁর ভাষায়, “আমার পিছুটান আর নেই। যদি আমাকে মেরেও ফেলে, অবাক হওয়ার কিছু নাই।”
সমাজের প্রতি প্রশ্ন:
বর্তমানে কোনো পরিবার বা স্থায়ী আশ্রয় ছাড়াই নিজ উদ্যোগে একটি ক্লদিং পেজ পরিচালনা করে জীবন চালানোর চেষ্টা করছেন তিনি। রিমুর জীবনকথা শুধু ব্যক্তিগত দুঃখগাথা নয়—এটি সমাজের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
একজন নারী একা হলে, সমাজ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে—রিমু রোজা খন্দকারের জীবন তারই নির্মম প্রমাণ। আর এসব জেনেও নীরব থাকলে দায় শুধু নিপীড়কদের নয়—সমাজের প্রতিটি নীরব মানুষেরও।
স্টাফ রিপোর্টার 

























