১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ থানা প্রতিষ্ঠার জোর দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রচারণা

বরিশাল জেলার বৃহত্তম উপজেলা বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখন একটাই— সরসী পুলিশ ফাঁড়িকে পূর্ণাঙ্গ থানায় উন্নীত করা। আইন-শৃঙ্খলা সেবা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার এলাকাবাসী এবার ঐক্যবদ্ধভাবে “বাকেরগঞ্জ পূর্বাঞ্চল থানা” বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত এই থানার আওতায় থাকবে চরামদ্দি, দাড়িয়াল, দুধল, দুর্গাপাশা, ফরিদপুর ও কবাই ইউনিয়ন। দুধল ইউনিয়নের সরসী বাজারে অবস্থিত বর্তমান পুলিশ ফাঁড়িটিকেই পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপান্তরের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

দূরত্ব ও দুর্ভোগে অতিষ্ঠ জনসাধারণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাকেরগঞ্জ সদর থানা থেকে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার দূরত্ব ২০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। নদী-খালবেষ্টিত চরাঞ্চল হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মামলা, জিডি কিংবা জরুরি পুলিশি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হয়।

দুধল ইউনিয়নের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, “রাত ১২টায় ডাকাত পড়লে থানায় ফোন দিলে পুলিশ আসতে ভোর হয়ে যায়। সরসী থানা হলে ১০ মিনিটেই সেবা পাওয়া সম্ভব হবে।”

অপরাধ দমনে প্রয়োজন দ্রুত পুলিশি সেবা
বিষখালী ও কারখানা নদী তীরবর্তী এই অঞ্চলে জলদস্যুতা, ডাকাতি, গরু চুরি, জমি দখল, মাদক চোরাচালান ও বাল্যবিবাহের ঘটনা প্রায়ই ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অপরাধ সংঘটনের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই নদীপথে পালিয়ে যায়।

চরামদ্দি ইউনিয়নের জেলে সমিতির সভাপতি বলেন, “নদীতে ইলিশ ধরতে গেলে প্রায়ই ডাকাতের কবলে পড়তে হয়। ফাঁড়িতে গেলে বলে থানায় যান, থানায় গেলে বলে দেরি হয়ে গেছে। আমরা অসহায়।”

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক মাহমুদা বেগম জানান, “এই ছয় ইউনিয়নে রয়েছে ৫৪টি ওয়ার্ড। নির্বাচন বা বড় কোনো ঘটনায় পুলিশ সদস্যের সংকট দেখা দেয়। পূর্ণাঙ্গ থানা হলে জননিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।”

বিদ্যমান অবকাঠামোই হতে পারে নতুন থানার ভিত্তি
১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সরসী পুলিশ ফাঁড়িটির নিজস্ব ৫০ শতাংশ জমি, আধাপাকা ভবন ও পুলিশ সদস্যদের আবাসন রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই শুধু জনবল ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা বাড়িয়ে এটিকে সহজেই পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

দুধল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, “বিষয়টি উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছেও লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “জনসংখ্যা, অপরাধ পরিসংখ্যান ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে।”

এলাকাবাসীর ৫ দফা দাবি
১. সরসী পুলিশ ফাঁড়িকে “বাকেরগঞ্জ পূর্বাঞ্চল থানা” নামে পূর্ণাঙ্গ থানা ঘোষণা
২. চরামদ্দি, দাড়িয়াল, দুধল, দুর্গাপাশা, ফরিদপুর ও কবাই ইউনিয়নকে নতুন থানার আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৩. একজন ওসি, ২ জন এসআই, ৮ জন এএসআই ও ৩০ জন কনস্টেবল পদায়ন
৪. টহলের জন্য ২টি পিকআপ, ৪টি মোটরসাইকেল ও ১টি স্পিডবোট বরাদ্দ
৫. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই থানার কার্যক্রম চালু

সামাজিক সংগঠনগুলোরও জোরালো সমর্থন, “গর্বের বাকেরগঞ্জ” উপজেলা শাখার সমন্বয়ক আফজাল হোসেন গাজী বলেন, “সরসী ফাঁড়ি থানায় উন্নীত হলে মাদক নির্মূল, সন্ত্রাস দমন, সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অবহেলিত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। পূর্বাঞ্চলের মানুষের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাই।”

সংগঠনটির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন মোহন বলেন, “বাকেরগঞ্জ উপজেলার আয়তন অনেক বড় এবং পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে থানা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এই এলাকার মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। তাই পূর্বাঞ্চলে একটি থানা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। তবে কোন কোন এলাকা নিয়ে থানা হবে এবং থানার নাম কী হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের প্রত্যাশা, জনগণের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

সময়ের দাবি ‘বাকেরগঞ্জ পূর্বাঞ্চল থানা’ প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার বিশাল বাকেরগঞ্জ উপজেলায় একটি থানা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। পূর্বাঞ্চলের মানুষের দাবি, নাগরিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং “আমার গ্রাম, আমার শহর” ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনই প্রয়োজন সরসী থানার বাস্তবায়ন।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

মাথায় পানির বোতল দিয়ে শিক্ষকের আঘাত, মুহূর্তেই জ্ঞান হারালো মুগ্ধ

বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ থানা প্রতিষ্ঠার জোর দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রচারণা

Update Time : ০৪:২২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

বরিশাল জেলার বৃহত্তম উপজেলা বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখন একটাই— সরসী পুলিশ ফাঁড়িকে পূর্ণাঙ্গ থানায় উন্নীত করা। আইন-শৃঙ্খলা সেবা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার এলাকাবাসী এবার ঐক্যবদ্ধভাবে “বাকেরগঞ্জ পূর্বাঞ্চল থানা” বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত এই থানার আওতায় থাকবে চরামদ্দি, দাড়িয়াল, দুধল, দুর্গাপাশা, ফরিদপুর ও কবাই ইউনিয়ন। দুধল ইউনিয়নের সরসী বাজারে অবস্থিত বর্তমান পুলিশ ফাঁড়িটিকেই পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপান্তরের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

দূরত্ব ও দুর্ভোগে অতিষ্ঠ জনসাধারণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাকেরগঞ্জ সদর থানা থেকে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার দূরত্ব ২০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। নদী-খালবেষ্টিত চরাঞ্চল হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মামলা, জিডি কিংবা জরুরি পুলিশি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হয়।

দুধল ইউনিয়নের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, “রাত ১২টায় ডাকাত পড়লে থানায় ফোন দিলে পুলিশ আসতে ভোর হয়ে যায়। সরসী থানা হলে ১০ মিনিটেই সেবা পাওয়া সম্ভব হবে।”

অপরাধ দমনে প্রয়োজন দ্রুত পুলিশি সেবা
বিষখালী ও কারখানা নদী তীরবর্তী এই অঞ্চলে জলদস্যুতা, ডাকাতি, গরু চুরি, জমি দখল, মাদক চোরাচালান ও বাল্যবিবাহের ঘটনা প্রায়ই ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অপরাধ সংঘটনের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই নদীপথে পালিয়ে যায়।

চরামদ্দি ইউনিয়নের জেলে সমিতির সভাপতি বলেন, “নদীতে ইলিশ ধরতে গেলে প্রায়ই ডাকাতের কবলে পড়তে হয়। ফাঁড়িতে গেলে বলে থানায় যান, থানায় গেলে বলে দেরি হয়ে গেছে। আমরা অসহায়।”

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক মাহমুদা বেগম জানান, “এই ছয় ইউনিয়নে রয়েছে ৫৪টি ওয়ার্ড। নির্বাচন বা বড় কোনো ঘটনায় পুলিশ সদস্যের সংকট দেখা দেয়। পূর্ণাঙ্গ থানা হলে জননিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।”

বিদ্যমান অবকাঠামোই হতে পারে নতুন থানার ভিত্তি
১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সরসী পুলিশ ফাঁড়িটির নিজস্ব ৫০ শতাংশ জমি, আধাপাকা ভবন ও পুলিশ সদস্যদের আবাসন রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই শুধু জনবল ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা বাড়িয়ে এটিকে সহজেই পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

দুধল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, “বিষয়টি উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছেও লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “জনসংখ্যা, অপরাধ পরিসংখ্যান ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে।”

এলাকাবাসীর ৫ দফা দাবি
১. সরসী পুলিশ ফাঁড়িকে “বাকেরগঞ্জ পূর্বাঞ্চল থানা” নামে পূর্ণাঙ্গ থানা ঘোষণা
২. চরামদ্দি, দাড়িয়াল, দুধল, দুর্গাপাশা, ফরিদপুর ও কবাই ইউনিয়নকে নতুন থানার আওতায় অন্তর্ভুক্তি
৩. একজন ওসি, ২ জন এসআই, ৮ জন এএসআই ও ৩০ জন কনস্টেবল পদায়ন
৪. টহলের জন্য ২টি পিকআপ, ৪টি মোটরসাইকেল ও ১টি স্পিডবোট বরাদ্দ
৫. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই থানার কার্যক্রম চালু

সামাজিক সংগঠনগুলোরও জোরালো সমর্থন, “গর্বের বাকেরগঞ্জ” উপজেলা শাখার সমন্বয়ক আফজাল হোসেন গাজী বলেন, “সরসী ফাঁড়ি থানায় উন্নীত হলে মাদক নির্মূল, সন্ত্রাস দমন, সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অবহেলিত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। পূর্বাঞ্চলের মানুষের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাই।”

সংগঠনটির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন মোহন বলেন, “বাকেরগঞ্জ উপজেলার আয়তন অনেক বড় এবং পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে থানা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এই এলাকার মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। তাই পূর্বাঞ্চলে একটি থানা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। তবে কোন কোন এলাকা নিয়ে থানা হবে এবং থানার নাম কী হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের প্রত্যাশা, জনগণের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

সময়ের দাবি ‘বাকেরগঞ্জ পূর্বাঞ্চল থানা’ প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার বিশাল বাকেরগঞ্জ উপজেলায় একটি থানা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। পূর্বাঞ্চলের মানুষের দাবি, নাগরিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং “আমার গ্রাম, আমার শহর” ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনই প্রয়োজন সরসী থানার বাস্তবায়ন।