১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাইলে ‘আকাশ ভেঙে পড়বে না’: কলকাতা হাইকোর্ট

পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলোতে জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করে রাজ্য সরকারের জারি করা একটি নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার (পিআইএল) শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি গাইলে ‘আকাশ ভেঙে পড়বে না’।

বুধবার (৫ আগস্ট) হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওই নির্দেশিকায় রাজ্যের মাদ্রাসাগুলোতে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা মামলার শুনানি করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের বেঞ্চ। মামলাকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।

‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার বিষয়ে ধর্মীয় পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, অন্য ধর্মের কোনো উদ্ধৃতি বা কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উচ্চারণ করলেই কি কারও ধর্মীয় পরিচয়ে প্রভাব পড়বে?

আদালত মন্তব্য করেন, এতে আকাশ ভেঙে পড়বে না…আজ যদি আমাকে এমন কোনো উদ্ধৃতি বলতে বলা হয়, যা আমার ধর্মের নয়, তাহলে কী হবে? আমি কি সেই ধর্মের বাইরের একজন ব্যক্তি হয়ে যাব?

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে আদালত আরও বলেন, বহু খ্রিস্টান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রার্থনায় অংশ নিতে হয়। সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন ভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের খ্রিস্টান ধর্মীয় বিষয়বস্তু গাইতে বা বলতে বলা হচ্ছে।

মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত নয়, জাতীয় গান। তাই মাদরাসার শিক্ষার্থীদের এটি গাওয়া বাধ্যতামূলক করা যায় না। জাতীয় সংগীতের সাংবিধানিক মর্যাদা জাতীয় গানের চেয়ে আলাদা বলেও তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ কুমার ত্রিবেদী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানির সময় আদালত রাজ্য সরকারের কাছে জানতে চায়, মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করলে কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না।

এরপর আদালত প্রশ্ন করেন, ‘কঠোরভাবে এই নির্দেশিকা বাস্তবায়নের জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কী?’ জবাবে মামলাকারীদের আইনজীবী বলেন, ‘এখনো নির্দেশিকাটি বাস্তবায়নের সাহস করেনি কর্তৃপক্ষ।’ আদালত তখন জানতে চায়, ‘এখনও পর্যন্ত কী কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?’

রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল আদালতের কাছে হলফনামার মাধ্যমে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও সময় চান। তিনি বলেন, কেবল আশঙ্কার ভিত্তিতে নির্দেশিকার ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়া যায় না। পরে রাজ্য সরকারের প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত মামলার শুনানি মুলতবি করেন আদালত।

এদিকে ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ নামে একটি বিল সম্প্রতি ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম বিল’ নামে পরিচিত এই বিলের মাধ্যমে জাতীয় গানকে জাতীয় সংগীতের সমপর্যায়ের আইনি মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে জাতীয় পতাকা, সংবিধান ও জাতীয় সংগীতের মর্যাদা রক্ষায় আইনগত সুরক্ষা থাকলেও জাতীয় গান সেই সুরক্ষার আওতায় ছিল না। নতুন বিলে জাতীয় গানে বাধা দেওয়া বা এর অবমাননাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

সুমন হত্যার বিচার ও খুনির ফাঁসির দাবিতে কবাই ইউনিয়ন বিএনপির মানববন্ধন

মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাইলে ‘আকাশ ভেঙে পড়বে না’: কলকাতা হাইকোর্ট

Update Time : ১১:৪৯:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলোতে জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করে রাজ্য সরকারের জারি করা একটি নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার (পিআইএল) শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি গাইলে ‘আকাশ ভেঙে পড়বে না’।

বুধবার (৫ আগস্ট) হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওই নির্দেশিকায় রাজ্যের মাদ্রাসাগুলোতে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা মামলার শুনানি করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের বেঞ্চ। মামলাকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।

‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার বিষয়ে ধর্মীয় পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, অন্য ধর্মের কোনো উদ্ধৃতি বা কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উচ্চারণ করলেই কি কারও ধর্মীয় পরিচয়ে প্রভাব পড়বে?

আদালত মন্তব্য করেন, এতে আকাশ ভেঙে পড়বে না…আজ যদি আমাকে এমন কোনো উদ্ধৃতি বলতে বলা হয়, যা আমার ধর্মের নয়, তাহলে কী হবে? আমি কি সেই ধর্মের বাইরের একজন ব্যক্তি হয়ে যাব?

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে আদালত আরও বলেন, বহু খ্রিস্টান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রার্থনায় অংশ নিতে হয়। সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন ভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের খ্রিস্টান ধর্মীয় বিষয়বস্তু গাইতে বা বলতে বলা হচ্ছে।

মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত নয়, জাতীয় গান। তাই মাদরাসার শিক্ষার্থীদের এটি গাওয়া বাধ্যতামূলক করা যায় না। জাতীয় সংগীতের সাংবিধানিক মর্যাদা জাতীয় গানের চেয়ে আলাদা বলেও তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ কুমার ত্রিবেদী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানির সময় আদালত রাজ্য সরকারের কাছে জানতে চায়, মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করলে কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না।

এরপর আদালত প্রশ্ন করেন, ‘কঠোরভাবে এই নির্দেশিকা বাস্তবায়নের জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কী?’ জবাবে মামলাকারীদের আইনজীবী বলেন, ‘এখনো নির্দেশিকাটি বাস্তবায়নের সাহস করেনি কর্তৃপক্ষ।’ আদালত তখন জানতে চায়, ‘এখনও পর্যন্ত কী কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?’

রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল আদালতের কাছে হলফনামার মাধ্যমে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও সময় চান। তিনি বলেন, কেবল আশঙ্কার ভিত্তিতে নির্দেশিকার ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়া যায় না। পরে রাজ্য সরকারের প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত মামলার শুনানি মুলতবি করেন আদালত।

এদিকে ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ নামে একটি বিল সম্প্রতি ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম বিল’ নামে পরিচিত এই বিলের মাধ্যমে জাতীয় গানকে জাতীয় সংগীতের সমপর্যায়ের আইনি মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে জাতীয় পতাকা, সংবিধান ও জাতীয় সংগীতের মর্যাদা রক্ষায় আইনগত সুরক্ষা থাকলেও জাতীয় গান সেই সুরক্ষার আওতায় ছিল না। নতুন বিলে জাতীয় গানে বাধা দেওয়া বা এর অবমাননাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।