২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১২ বছরের নির্মাণযন্ত্রণা, হাজার কোটি টাকার ব্যয়- জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কবে?

কেন ভেঙে ফেলা হবে টঙ্গী-গাজীপুরের বিআরটি সড়ক?

ঢাকার উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত জনপথ গাজীপুর থেকে টঙ্গী হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত বিআরটি (বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট) প্রকল্প। রাজধানীর সঙ্গে গাজীপুরের যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার প্রত্যাশায় যে প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পেরিয়েও তা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ দেখেনি। বরং জনদুর্ভোগ, যানজট, দুর্ঘটনা, অব্যবস্থাপনা ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের এক বহুল আলোচিত উদাহরণে পরিণত হয়েছে প্রকল্পটি।

এখন সেই বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে দুই পাশে তিন লেন করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রশ্ন উঠেছে- যে প্রকল্প নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলো, বছরের পর বছর মানুষ দুর্ভোগ পোহাল, সেই প্রকল্পের অবকাঠামো আবার ভেঙে ফেলতে হবে কেন? আর এই ব্যর্থতার দায় নেবে কে?

ভুল পরিকল্পনার মাশুল কেন দেবে জনগণ?
২০১২ সালে শুরু হওয়া গাজীপুর-ঢাকা বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলেও চালু করা যায়নি কাঙ্ক্ষিত বিআরটি বাসসেবা। প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হলেও সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তত দিনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, বিপুল অর্থ ব্যয় করে যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলো, তা দিয়ে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—দ্রুত ও কার্যকর গণপরিবহনব্যবস্থা চালু—বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এখন সেই অবকাঠামোর একটি অংশ অপসারণ করে নতুনভাবে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এখানেই বড় প্রশ্ন—প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন, সম্ভাব্যতা যাচাই, নির্মাণ তদারকি ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে কি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা হয়েছিল? যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পটি প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হলো কেন? আর যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ভুল পরিকল্পনা কিংবা অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে না কেন?

জনগণের করের টাকা ব্যয় করে প্রকল্প নির্মাণ, আবার সেই প্রকল্পের অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে নির্মাণ—এ যেন একই ক্ষতির বোঝা জনগণের কাঁধে বারবার চাপিয়ে দেওয়া।

সড়ক আছে, কিন্তু স্বস্তি কোথায়?
বিআরটি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা হলো এর নকশা, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। গাজীপুর থেকে টঙ্গী হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত এই সড়কে চলাচলকারী মানুষ বছরের পর বছর নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।

কোথাও সড়কের মাঝখানে বিভাজক, কোথাও উড়ালসড়ক, কোথাও পথচারীদের চলাচলের জন্য জটিল পারাপারব্যবস্থা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একজন পথচারীকে নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া আধুনিক সড়ক পরিকল্পনার অন্যতম মৌলিক শর্ত। অথচ কোনো সড়ক পার হতে গিয়ে মানুষকে যদি একাধিক ধাপে যানবাহনের গতিপথ অতিক্রম করতে হয়, তবে সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পারাপার, ফুটপাত, সড়কবাতি ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ করেও প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে, বিআরটি উড়ালসড়ক ও এর সিঁড়ি ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ছিনতাই ও হামলার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোনো অবকাঠামো মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করার পরিবর্তে ভয়ের কারণ হয়ে উঠলে তার নকশা ও ব্যবস্থাপনা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

১২ বছরের নির্মাণযন্ত্রণা, এরপর আবার ভাঙার যন্ত্রণা!
গাজীপুর-টঙ্গী-উত্তরা অঞ্চলের মানুষের কাছে বিআরটি শুধু একটি ব্যর্থ প্রকল্পের নাম নয়; এটি দীর্ঘদিনের যানজট, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তার প্রতীক।

কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও তাঁদের স্বজনদের প্রতিদিন এই পথে চলাচল করতে হয়। যানজটে আটকে থেকে কত মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে, কত ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত জরুরি যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব হয়তো কোনো দাপ্তরিক নথিতে নেই। কিন্তু ভুক্তভোগী মানুষের জীবনে এর ক্ষত বাস্তব।

এখন বিআরটির অবকাঠামো অপসারণ করে ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই নতুন কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে? নির্মাণ চলাকালে যান চলাচল কীভাবে স্বাভাবিক রাখা হবে? আগের মতো বছরের পর বছর দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়?

সরকারের উচিত হবে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন কাজের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা, পর্যায়ক্রমে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা এবং যান চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি না হয়।

ভুলের দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্তকে অনেকে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে সড়কটিকে নিরাপদ, কার্যকর ও যানজটমুক্ত যোগাযোগব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হবে।

তবে শুধু অবকাঠামো ভেঙে ফেললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেন প্রকল্পটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারল না, কোন পর্যায়ে কী ধরনের ভুল বা ব্যর্থতা ঘটেছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা অবহেলা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

যাঁদের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত কিংবা দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতা প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের নথিপত্র, ব্যয়, চুক্তি, নকশা পরিবর্তন এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

কারণ, জনগণের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দায় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও প্রয়োজন।

ছয় লেনের মহাসড়ক হোক জনস্বস্তির নতুন দিগন্ত
বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা যেন কেবল সড়কের চেহারা পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পুরো করিডোরের যোগাযোগব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।

সড়কের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপার, কার্যকর ফুটপাত, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, উন্নত ড্রেনেজব্যবস্থা, সঠিক সাইনবোর্ড, যানবাহন চলাচলের শৃঙ্খলা এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

টঙ্গী স্টেশন রোড, টঙ্গী বাজার, কলেজ গেট, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে যান চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। স্থানীয় মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তুরাগ নদীকেন্দ্রিক নৌযান চলাচলের মতো বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

দুটি দুই লেনের ওভারপাসকে চার লেনে উন্নীত করার যে প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে, সেটিরও কারিগরি সম্ভাব্যতা, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন পরিকল্পনা যেন আবার কোনো ব্যর্থ প্রকল্পের জন্ম না দেয়, সে জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শেষ কথা
উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক, সেতু, উড়ালসড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের জীবন সহজ করা, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার করা।

বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত নকশা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া বড় বাজেটের প্রকল্পও জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত যদি গাজীপুর-টঙ্গী-ঢাকা বিমানবন্দর সড়কের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করতে পারে, তবে তা অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন আবার নতুন দুর্ভোগের আড়ালে হারিয়ে না যায়।

আমরা চাই, বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক এবং নতুন মহাসড়ক নির্মাণে আর একদিনও অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট না হোক।

১২ বছরের নির্মাণযন্ত্রণা শেষে মানুষ আরেকটি দীর্ঘ দুর্ভোগের অধ্যায়ে প্রবেশ করতে চায় না। জনগণের প্রত্যাশা একটাই—নিরাপদ সড়ক, নির্বিঘ্ন যাতায়াত, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং উন্নয়নের সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।

জনদুর্ভোগের অবসান হোক। উন্নয়ন হোক মানুষের জন্য, মানুষের অর্থে—মানুষের স্বার্থেই।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

কক্সবাজারের ইনানীতে মাটি ফুঁড়ে বের হচ্ছে গ্যাস ও আগুন, এলাকায় আতঙ্ক

১২ বছরের নির্মাণযন্ত্রণা, হাজার কোটি টাকার ব্যয়- জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কবে?

কেন ভেঙে ফেলা হবে টঙ্গী-গাজীপুরের বিআরটি সড়ক?

Update Time : ০৯:০৪:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত জনপথ গাজীপুর থেকে টঙ্গী হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত বিআরটি (বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট) প্রকল্প। রাজধানীর সঙ্গে গাজীপুরের যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার প্রত্যাশায় যে প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পেরিয়েও তা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ দেখেনি। বরং জনদুর্ভোগ, যানজট, দুর্ঘটনা, অব্যবস্থাপনা ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের এক বহুল আলোচিত উদাহরণে পরিণত হয়েছে প্রকল্পটি।

এখন সেই বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে দুই পাশে তিন লেন করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রশ্ন উঠেছে- যে প্রকল্প নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলো, বছরের পর বছর মানুষ দুর্ভোগ পোহাল, সেই প্রকল্পের অবকাঠামো আবার ভেঙে ফেলতে হবে কেন? আর এই ব্যর্থতার দায় নেবে কে?

ভুল পরিকল্পনার মাশুল কেন দেবে জনগণ?
২০১২ সালে শুরু হওয়া গাজীপুর-ঢাকা বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলেও চালু করা যায়নি কাঙ্ক্ষিত বিআরটি বাসসেবা। প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হলেও সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তত দিনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, বিপুল অর্থ ব্যয় করে যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলো, তা দিয়ে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—দ্রুত ও কার্যকর গণপরিবহনব্যবস্থা চালু—বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এখন সেই অবকাঠামোর একটি অংশ অপসারণ করে নতুনভাবে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এখানেই বড় প্রশ্ন—প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন, সম্ভাব্যতা যাচাই, নির্মাণ তদারকি ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে কি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা হয়েছিল? যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পটি প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হলো কেন? আর যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ভুল পরিকল্পনা কিংবা অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে না কেন?

জনগণের করের টাকা ব্যয় করে প্রকল্প নির্মাণ, আবার সেই প্রকল্পের অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে নির্মাণ—এ যেন একই ক্ষতির বোঝা জনগণের কাঁধে বারবার চাপিয়ে দেওয়া।

সড়ক আছে, কিন্তু স্বস্তি কোথায়?
বিআরটি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা হলো এর নকশা, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। গাজীপুর থেকে টঙ্গী হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত এই সড়কে চলাচলকারী মানুষ বছরের পর বছর নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।

কোথাও সড়কের মাঝখানে বিভাজক, কোথাও উড়ালসড়ক, কোথাও পথচারীদের চলাচলের জন্য জটিল পারাপারব্যবস্থা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একজন পথচারীকে নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া আধুনিক সড়ক পরিকল্পনার অন্যতম মৌলিক শর্ত। অথচ কোনো সড়ক পার হতে গিয়ে মানুষকে যদি একাধিক ধাপে যানবাহনের গতিপথ অতিক্রম করতে হয়, তবে সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পারাপার, ফুটপাত, সড়কবাতি ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ করেও প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে, বিআরটি উড়ালসড়ক ও এর সিঁড়ি ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ছিনতাই ও হামলার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোনো অবকাঠামো মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করার পরিবর্তে ভয়ের কারণ হয়ে উঠলে তার নকশা ও ব্যবস্থাপনা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

১২ বছরের নির্মাণযন্ত্রণা, এরপর আবার ভাঙার যন্ত্রণা!
গাজীপুর-টঙ্গী-উত্তরা অঞ্চলের মানুষের কাছে বিআরটি শুধু একটি ব্যর্থ প্রকল্পের নাম নয়; এটি দীর্ঘদিনের যানজট, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তার প্রতীক।

কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও তাঁদের স্বজনদের প্রতিদিন এই পথে চলাচল করতে হয়। যানজটে আটকে থেকে কত মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে, কত ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত জরুরি যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব হয়তো কোনো দাপ্তরিক নথিতে নেই। কিন্তু ভুক্তভোগী মানুষের জীবনে এর ক্ষত বাস্তব।

এখন বিআরটির অবকাঠামো অপসারণ করে ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই নতুন কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে? নির্মাণ চলাকালে যান চলাচল কীভাবে স্বাভাবিক রাখা হবে? আগের মতো বছরের পর বছর দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়?

সরকারের উচিত হবে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন কাজের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা, পর্যায়ক্রমে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা এবং যান চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি না হয়।

ভুলের দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্তকে অনেকে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে সড়কটিকে নিরাপদ, কার্যকর ও যানজটমুক্ত যোগাযোগব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হবে।

তবে শুধু অবকাঠামো ভেঙে ফেললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেন প্রকল্পটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারল না, কোন পর্যায়ে কী ধরনের ভুল বা ব্যর্থতা ঘটেছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা অবহেলা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

যাঁদের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত কিংবা দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতা প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের নথিপত্র, ব্যয়, চুক্তি, নকশা পরিবর্তন এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

কারণ, জনগণের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দায় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও প্রয়োজন।

ছয় লেনের মহাসড়ক হোক জনস্বস্তির নতুন দিগন্ত
বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা যেন কেবল সড়কের চেহারা পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পুরো করিডোরের যোগাযোগব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।

সড়কের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপার, কার্যকর ফুটপাত, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, উন্নত ড্রেনেজব্যবস্থা, সঠিক সাইনবোর্ড, যানবাহন চলাচলের শৃঙ্খলা এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

টঙ্গী স্টেশন রোড, টঙ্গী বাজার, কলেজ গেট, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে যান চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। স্থানীয় মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তুরাগ নদীকেন্দ্রিক নৌযান চলাচলের মতো বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

দুটি দুই লেনের ওভারপাসকে চার লেনে উন্নীত করার যে প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে, সেটিরও কারিগরি সম্ভাব্যতা, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন পরিকল্পনা যেন আবার কোনো ব্যর্থ প্রকল্পের জন্ম না দেয়, সে জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শেষ কথা
উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক, সেতু, উড়ালসড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের জীবন সহজ করা, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার করা।

বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত নকশা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া বড় বাজেটের প্রকল্পও জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত যদি গাজীপুর-টঙ্গী-ঢাকা বিমানবন্দর সড়কের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করতে পারে, তবে তা অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন আবার নতুন দুর্ভোগের আড়ালে হারিয়ে না যায়।

আমরা চাই, বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক এবং নতুন মহাসড়ক নির্মাণে আর একদিনও অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট না হোক।

১২ বছরের নির্মাণযন্ত্রণা শেষে মানুষ আরেকটি দীর্ঘ দুর্ভোগের অধ্যায়ে প্রবেশ করতে চায় না। জনগণের প্রত্যাশা একটাই—নিরাপদ সড়ক, নির্বিঘ্ন যাতায়াত, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং উন্নয়নের সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।

জনদুর্ভোগের অবসান হোক। উন্নয়ন হোক মানুষের জন্য, মানুষের অর্থে—মানুষের স্বার্থেই।