তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক প্রার্থী আইনের চোখে সমান—এই নীতিই গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড। নাহিদও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি এখন অন্য ৩০০ জন প্রার্থীর মতোই একজন প্রার্থী; অতিরিক্ত কোনো সাংবিধানিক মর্যাদা তাঁর নেই। যদিও তিনি ৩০টির বেশি আসনে নির্বাচন করা একটি দলের আহ্বায়ক, তবু গণঅভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক আবেগকে আলাদা সত্তা হিসেবে আরপিও কোনো বিশেষ স্বীকৃতি দেয় না। নির্বাচন কমিশনের একমাত্র দায়িত্ব—সবাইকে সমান মাটিতে দাঁড় করানো।
কিন্তু বাস্তবতা যখন আইনের ওপরে উঠে বসে, তখন প্রশ্ন জাগে—সমতার সেই মাটি কি এখনও অটুট আছে?
নাহিদ চাইলে তাঁর রাজনৈতিক পরিসরের জনগণের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন বক্তব্য রাখতে পারেন। এটি তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু প্রতিটি অধিকারেরই একটি আইনি সীমানা আছে। সেই সীমানা অতিক্রম করলেই অধিকার আর অধিকার থাকে না—তা হয়ে ওঠে বিশেষ সুবিধা। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার জন্য অসংখ্য বেসরকারি মাধ্যম খোলা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে ব্যবহার করা ছিল একটি রাজনৈতিক শর্টকাট, যা তাঁর বক্তব্যকে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু একজন প্রার্থীর সুবিধা হয়নি; প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিনিধিত্বে, রাষ্ট্রীয় প্রচারে নয়।
যে দল এখনো সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করেনি, তার আহ্বায়ক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দলের পক্ষে ভোট চেয়ে ভাষণ দেবেন—এমন নজির গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জনগণের কর ও ভ্যাটের অর্থে চলে। সেই অর্থে প্রত্যেক নাগরিকের সমান মালিকানা আছে। অথচ আমার নির্বাচনী আসনে নাহিদের কোনো প্রার্থী নেই, কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। তাঁর ভাষণ আমার রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুপস্থিত একটি ছায়া মাত্র। আমি তাঁর বক্তব্য শুনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি না, তাঁর দলকে সরকারে পাঠানোর বাস্তব সম্ভাবনাও নেই। তাহলে এই ভাষণের সুফল আমার জন্য কোথায়?
তবুও আমার অর্থে সম্প্রচারিত হয়েছে এমন একটি ভাষণ, যা আমার ভোটাধিকারকে স্পর্শই করে না। অন্যের রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণে আমার করের অর্থ ব্যয় হয়েছে—এ অনুভূতি ক্ষোভ নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে, নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় লড়াই ব্যালটের নয়—বিশ্বাসের। নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা যদি চিড় খায়, তবে অবাধ নির্বাচনও সন্দেহের কুয়াশায় ঢেকে যায়। তাই এখন প্রয়োজন কঠোর সমতা, নির্মোহ স্বচ্ছতা এবং আইনের অন্ধ প্রয়োগ। কোনো ব্যক্তি, কোনো দল, কোনো আবেগ—আইনের ওপরে নয়।
গণতন্ত্র তখনই বাঁচে, যখন রাষ্ট্র নিজেই নিজের প্রিয়পাত্র তৈরি করা বন্ধ করে।
ভোটের মাঠে সবাই সমান—এই সত্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় বিপ্লব।
মোজাম্মেল হোসেন মোহন 





















