১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিদেশি পুনর্বীমা প্রিমিয়ামে কর ছাড়, শক্তিশালী হবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদেশি পুনর্বীমা (Reinsurance) প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বীমা খাতের জন্য আলাদা কোনো বড় সংস্কার প্যাকেজ না থাকলেও এ পদক্ষেপ দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রস্তাব ঘোষণা করেন। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বীমা খাতকে কেন্দ্র করে পৃথক কোনো সংস্কার অধ্যায় না থাকলেও করনীতি ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত বীমা শিল্পের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

বর্তমান বিধান অনুযায়ী, নন-লাইফ বীমা খাতের পুনর্বীমাযোগ্য প্রিমিয়ামের ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশনের মাধ্যমে পুনর্বীমা করতে হয়। বাকি ৫০ শতাংশ বিদেশি পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। এতদিন এসব প্রতিষ্ঠানে পরিশোধিত প্রিমিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হলেও নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে তা কমে ৫ শতাংশে নেমে আসবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অবকাঠামো প্রকল্প, জাহাজ, বিমান এবং উচ্চমূল্যের অন্যান্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলো বিদেশি পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে করহার কমানো হলে পুনর্বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বহনের ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ লক্ষ্যে পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত সম্প্রসারণের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

তবে কর কাঠামোর ক্ষেত্রে পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪০ শতাংশ বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ খাতে নতুন কোনো কর রেয়াত বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।

এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের ইক্যুইটি বিনিয়োগের একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্য লভ্যাংশ ও মুনাফার তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বীমা খাতের অংশীজনদের মতে, বীমা প্রবেশ হার বৃদ্ধি, ডিজিটাল বীমা সেবার সম্প্রসারণ, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, নতুন বীমা পণ্য উদ্ভাবন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এবারের বাজেটে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব পায়নি। ফলে করহার কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও খাতটির সামগ্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য আরও সুদূরপ্রসারী নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের রোগীদের জন্য ৬ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার নির্দেশ

বিদেশি পুনর্বীমা প্রিমিয়ামে কর ছাড়, শক্তিশালী হবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

Update Time : ০৭:৩২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদেশি পুনর্বীমা (Reinsurance) প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বীমা খাতের জন্য আলাদা কোনো বড় সংস্কার প্যাকেজ না থাকলেও এ পদক্ষেপ দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রস্তাব ঘোষণা করেন। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বীমা খাতকে কেন্দ্র করে পৃথক কোনো সংস্কার অধ্যায় না থাকলেও করনীতি ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত বীমা শিল্পের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

বর্তমান বিধান অনুযায়ী, নন-লাইফ বীমা খাতের পুনর্বীমাযোগ্য প্রিমিয়ামের ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশনের মাধ্যমে পুনর্বীমা করতে হয়। বাকি ৫০ শতাংশ বিদেশি পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। এতদিন এসব প্রতিষ্ঠানে পরিশোধিত প্রিমিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হলেও নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে তা কমে ৫ শতাংশে নেমে আসবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অবকাঠামো প্রকল্প, জাহাজ, বিমান এবং উচ্চমূল্যের অন্যান্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলো বিদেশি পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে করহার কমানো হলে পুনর্বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বহনের ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ লক্ষ্যে পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত সম্প্রসারণের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

তবে কর কাঠামোর ক্ষেত্রে পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার ৪০ শতাংশ বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ খাতে নতুন কোনো কর রেয়াত বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।

এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের ইক্যুইটি বিনিয়োগের একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্য লভ্যাংশ ও মুনাফার তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বীমা খাতের অংশীজনদের মতে, বীমা প্রবেশ হার বৃদ্ধি, ডিজিটাল বীমা সেবার সম্প্রসারণ, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, নতুন বীমা পণ্য উদ্ভাবন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এবারের বাজেটে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব পায়নি। ফলে করহার কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও খাতটির সামগ্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য আরও সুদূরপ্রসারী নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।