১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদকের ছোবলে শিশু-কিশোর: ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান ও অবৈধ মাদকের বিস্তার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্তি। একসময় মাদকাসক্তি মূলত তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, পথশিশু এবং কিশোরদের মধ্যেও। মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক অবহেলা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে কোমলমতি শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে এই ভয়ংকর নেশার জালে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিস্তার এখন আর নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শহরের নামী-দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ, বস্তি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাদকের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু-কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদক ব্যবসায় জড়িত সিন্ডিকেটগুলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে শিশুদের ‘ক্যারিয়ার’ বা মাদক বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিশু কৌতূহলবশত কিংবা প্রলোভনের শিকার হয়ে নিজেরাও মাদক গ্রহণ শুরু করে এবং একসময় ভয়াবহ আসক্তিতে পরিণত হয়।

শিশুদের মাদকাসক্তির প্রধান কারণ
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পেছনে একাধিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

মাদকের সহজলভ্যতা:
বর্তমানে শহর ও গ্রামের অলিগলিতে সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া যায়। সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুরা আঠা, ড্যান্ডি কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বিত্তশালী পরিবারের অনেক সন্তান ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

পারিবারিক কলহ ও অবহেলা:
বাবা-মায়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা সন্তানদের প্রতি পর্যাপ্ত সময় ও যত্নের অভাব শিশুদের মধ্যে একাকীত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপ তৈরি করে। এসব পরিস্থিতি অনেক শিশুকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়।

সঙ্গদোষ ও কৌতূহল:
কৈশোরে বন্ধুদের প্ররোচনা এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ থেকে অনেকেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে স্থায়ী আসক্তিতে রূপ নেয়।

ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার ও অপসংস্কৃতি:
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিভিন্ন কনটেন্টে মাদকের গ্ল্যামারাইজড উপস্থাপন এবং নেতিবাচক সাংস্কৃতিক প্রভাব অনেক কিশোর-কিশোরীকে মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করছে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। মাদকাসক্ত শিশুরা শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকিতে থাকে। ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

করণীয়
মাদকমুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি পারিবারিক নজরদারি বৃদ্ধি, নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তির এই ভয়াবহ বিস্তার ভবিষ্যতে জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই দেশের আগামী প্রজন্মকে রক্ষায় সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

মাদকের ছোবলে শিশু-কিশোর: ঝুঁকিতে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

Update Time : ০৬:২৪:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান ও অবৈধ মাদকের বিস্তার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্তি। একসময় মাদকাসক্তি মূলত তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, পথশিশু এবং কিশোরদের মধ্যেও। মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক অবহেলা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে কোমলমতি শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে এই ভয়ংকর নেশার জালে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাদকের বিস্তার এখন আর নির্দিষ্ট কোনো এলাকা বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শহরের নামী-দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ, বস্তি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাদকের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু-কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদক ব্যবসায় জড়িত সিন্ডিকেটগুলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে শিশুদের ‘ক্যারিয়ার’ বা মাদক বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিশু কৌতূহলবশত কিংবা প্রলোভনের শিকার হয়ে নিজেরাও মাদক গ্রহণ শুরু করে এবং একসময় ভয়াবহ আসক্তিতে পরিণত হয়।

শিশুদের মাদকাসক্তির প্রধান কারণ
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পেছনে একাধিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

মাদকের সহজলভ্যতা:
বর্তমানে শহর ও গ্রামের অলিগলিতে সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া যায়। সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুরা আঠা, ড্যান্ডি কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বিত্তশালী পরিবারের অনেক সন্তান ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

পারিবারিক কলহ ও অবহেলা:
বাবা-মায়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা সন্তানদের প্রতি পর্যাপ্ত সময় ও যত্নের অভাব শিশুদের মধ্যে একাকীত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপ তৈরি করে। এসব পরিস্থিতি অনেক শিশুকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়।

সঙ্গদোষ ও কৌতূহল:
কৈশোরে বন্ধুদের প্ররোচনা এবং নতুন কিছু জানার আগ্রহ থেকে অনেকেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে স্থায়ী আসক্তিতে রূপ নেয়।

ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার ও অপসংস্কৃতি:
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিভিন্ন কনটেন্টে মাদকের গ্ল্যামারাইজড উপস্থাপন এবং নেতিবাচক সাংস্কৃতিক প্রভাব অনেক কিশোর-কিশোরীকে মাদক গ্রহণে উৎসাহিত করছে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। মাদকাসক্ত শিশুরা শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকিতে থাকে। ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

করণীয়
মাদকমুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি পারিবারিক নজরদারি বৃদ্ধি, নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তির এই ভয়াবহ বিস্তার ভবিষ্যতে জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই দেশের আগামী প্রজন্মকে রক্ষায় সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।