বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত নিষ্পাপ শিশু, কিশোরী ও নারীরা এই বর্বরতার শিকার হচ্ছে, যা শুধু ভুক্তভোগী পরিবারকেই নয়, পুরো জাতিকেই নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার মধ্যে ফেলছে।
মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিকদের মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের প্রতি দৃশ্যমান কঠোরতার অভাবের কারণে এই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, ফলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলে এবং অপরাধীরা সাহস পেয়ে যায়।
ভয়াবহ বাস্তবতা
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, ধর্ষণের শিকারদের একটি বড় অংশই শিশু। কখনও চকোলেট বা খেলনার লোভ দেখিয়ে, কখনও একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের টার্গেট করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—ঘর, বিদ্যালয়, প্রতিবেশ কিংবা পরিচিত পরিবেশ—কোথাও শিশুরা পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
এই পরিস্থিতি দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে এমন নির্মম অপরাধ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
ধর্ষণের মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার কারণে অনেক সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ দুর্বল হয়ে পড়ে। তদন্তে বিলম্ব, আইনি জটিলতা এবং সাক্ষী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা জামিনে মুক্ত হয়ে যায় কিংবা শাস্তি এড়িয়ে যায়।
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বা অপরাধী চক্রের চাপের মুখে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। ফলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
সামাজিক ও মানসিক ক্ষত
যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তি শুধু শারীরিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়েও যায়। বিচারহীনতা সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে তোলে। অনেক পরিবার সামাজিক অপমান, ভয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে, দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে যাচ্ছে। এটি সমাজে এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; তার কার্যকর ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল: ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন।
শিশু সুরক্ষা জোরদার: প্রতিটি এলাকায় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা: সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয়ভীতি ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিরোধ: পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। একটি নিরাপদ, মানবিক ও সভ্য বাংলাদেশ গড়তে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মোঃ ফাইজুল ইসলাম রাজু 














