বাকেরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নদীর চর ও নদীতীরের ফসলি জমির মাটি লুটের ভয়াবহ উৎসব চলছে। রাতের আঁধার থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দিবালোকে ভাসমান পল্টন ও ভেকু মেশিন ব্যবহার করে সরকারি নদীর চর, ভেরিবাঁধ এবং ফসলি জমি কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে একাধিক প্রভাবশালী ও সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এসব সিন্ডিকেটের কাছে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে প্রশাসন।
ইট পোড়ানোর মৌসুম শুরু হওয়ায় উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে শতাধিক ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। ভাটার মালিকরা কখনো ফসলি জমি কিনে, আবার কখনো অবৈধভাবে নদীর চর ও নদীতীরের মাটি সংগ্রহ করে ইট উৎপাদন করছেন। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে কয়েকগুণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ইটভাটার মালিক স্থানীয় ভূমিদস্যুদের মাধ্যমে নদীর চর, নদীতীরের ফসলি জমি এমনকি ভেরিবাঁধ কেটে মাটি ভাটায় নিয়ে যাচ্ছেন। এতে নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফরিদপুর ইউনিয়নের কারখানা নদীর চর, নলুয়া ও কলসকাঠী ইউনিয়নের পান্ডব নদীর চরে প্রকাশ্যেই প্রতিদিন মাটি কাটছে ভূমিদস্যুরা। কলসকাঠী ইউনিয়নের বাগদিয়া গ্রামে ভাসমান পল্টন ও ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাকিব, সাহিন, সেলিম মেম্বারসহ প্রায় ২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
এ ছাড়া কলসকাঠীর দক্ষিণ সাদিস গ্রাম (আমিনপুর চর) থেকে হাবিব মাওলানার মাদ্রাসা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ খাস সরকারি জমির মাটিও দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে কাটা হচ্ছে। স্থানীয় শামীম শরীফ, মনির, আনোয়ার, প্রিন্সসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিদিন এখান থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের অভিযোগ, কলসকাঠী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আল আমিন ও নিমাই কীর্তনীয়ার নেতৃত্বে একটি ভয়ংকর সিন্ডিকেট কলসকাঠীর বিভিন্ন এলাকায় নদীর চর থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করছে। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে হুমকি, ভয়ভীতি ও নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
অন্যদিকে নলুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পান্ডব নদীর ভেরিবাঁধ কৃষিজমি ও জনপদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দুষ্কৃতিকারীরা রাতের আঁধারে বাঁধ কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে ফসলি জমি ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে নদীভাঙনের আশঙ্কা বেড়েই চলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ট্রলারে ও ভেকু মেশিন দিয়ে কলসকাঠী ইউনিয়নের আমিনপুর পান্ডব নদীর চর থেকে মাটি কেটে অর্ধশতাধিক ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর এখান থেকে কোটি কোটি টাকার মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করছে চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নলুয়া ইউনিয়নের কৃষক বারেক হাওলাদার বলেন, “ভেরিবাঁধ ছাড়া আমাদের জমি টিকবে না। অথচ কিছু লোক রাতের বেলা বাঁধ কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। বাধা দিলে আমাদের ভয় দেখানো হয়।”
এদিকে সেসার্স ওয়ান নীপা ব্রিকসের মালিক মাসুদ হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, “স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট দিন-রাত ভেকু মেশিন ও পল্টন দিয়ে নদীর চর, ভেরিবাঁধ ও মানুষের মালিকানাধীন জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছে। এতে নদীভাঙন বাড়ছে, বসতভিটা ও ইটভাটাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।”
স্থানীয়দের দাবি, একাধিকবার প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ভূমিদস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অবিলম্বে অবৈধ মাটিকাটা বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও এলাকাবাসী।
ডেস্ক রিপোর্টঃ 



















