০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে নীরব আত্মঘাতী সংকট: প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের আত্মহত্যা, শীর্ষে যশোর

দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে। সোমবার রাজধানীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ক্রাইম) মো. আশরাফুল ইসলাম এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি যশোর জেলায়।

বাংলাদেশ জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা (খসড়া) নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যৌথভাবে এর আয়োজন করে আইসিডিডিআরবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

প্রকৃত সংখ্যা তিন গুণ বেশি

আত্মহত্যা বিষয়ে সাধারণত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ব্যবহার করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে উঠে আসে অনুষ্ঠানে। ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৭১৪টি। তবে পুলিশের নথি অনুযায়ী একই বছরে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর ঘটনা ছিল ১৫ হাজার ৫০টি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অনুমিত সংখ্যার তুলনায় প্রকৃত সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি।

আইসিডিডিআরবির মানসিক স্বাস্থ্য প্রকল্পের সহকারী সমন্বয়ক মোহাম্মদ সোহেল শমীক জানান, ডব্লিউএইচওর হিসাবে প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ২ দশমিক ৮ হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী এই হার ৮ দশমিক ৬৮। এতে স্পষ্ট হয়, আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্র অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

পাঁচ বছরে ৭৩ হাজারের বেশি আত্মহত্যা

পুলিশের উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে মোট ৭৩ হাজার ৫৯৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। গড়ে বছরে ১৪ হাজার ৭১৯ জন এবং দিনে প্রায় ৪০ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১২ হাজার ৩৩৫টি, যা দৈনিক গড়ে ৪১ জনের কাছাকাছি।

কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলেও জানান আশরাফুল ইসলাম।

ফাঁস ও বিষপান সবচেয়ে বেশি

পুলিশের তথ্যে আত্মহত্যার পদ্ধতি হিসেবে ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন দেওয়া, রেললাইনে ঝাঁপ ও অন্যান্য উপায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি ফাঁস, এরপর বিষপান।

মামলার হিসাবে দেখা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যশোর জেলায় আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৫৪টি। এরপর ঢাকা জেলায় ১ হাজার ৪০২টি এবং কুমিল্লায় ১ হাজার ২৮৮টি মামলা হয়েছে।

কৃষির বিষে বাড়ছে ঝুঁকি

অনুষ্ঠানে আত্মহত্যায় কীটনাশক ও আগাছানাশকের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শফিকুল ইসলাম জানান, দেশে বর্তমানে ৩৪২ ধরনের কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে ঘাসনাশক সবচেয়ে বিপজ্জনক। সরকার ইতোমধ্যে দুটি ঘাসনাশকের আমদানি লাইসেন্স বন্ধ করেছে এবং ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কীটনাশকের সহজলভ্যতা কমানো গেলে আত্মহত্যার হারও কমতে পারে। ভারতের কিছু এলাকায় কমিউনিটি উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের ঘরে কীটনাশক না রেখে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ইতিবাচক ফল দিয়েছে।

অপরাধ নয়, মানসিক সংকট

আলোচকরা বলেন, আত্মহত্যা মূলত মানসিক বিপর্যয়ের ফল। কিন্তু বর্তমান আইনে আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ফলে আত্মহত্যাচেষ্টায় ব্যর্থ ব্যক্তিকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। এতে সামাজিক সম্মানহানি ও আইনি ভয়ের কারণে অনেক ঘটনা গোপন থেকে যায়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, স্বরাষ্ট্র, ধর্ম ও তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নীরব সংকট মোকাবিলা করতে।

Tag :
About Author Information

Mohon

জনপ্রিয় খবর

রাজশাহীকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে বাকেরগঞ্জের মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

দেশে নীরব আত্মঘাতী সংকট: প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের আত্মহত্যা, শীর্ষে যশোর

Update Time : ০৮:৩৫:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে। সোমবার রাজধানীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ক্রাইম) মো. আশরাফুল ইসলাম এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি যশোর জেলায়।

বাংলাদেশ জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা (খসড়া) নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যৌথভাবে এর আয়োজন করে আইসিডিডিআরবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

প্রকৃত সংখ্যা তিন গুণ বেশি

আত্মহত্যা বিষয়ে সাধারণত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ব্যবহার করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে উঠে আসে অনুষ্ঠানে। ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৭১৪টি। তবে পুলিশের নথি অনুযায়ী একই বছরে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর ঘটনা ছিল ১৫ হাজার ৫০টি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অনুমিত সংখ্যার তুলনায় প্রকৃত সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি।

আইসিডিডিআরবির মানসিক স্বাস্থ্য প্রকল্পের সহকারী সমন্বয়ক মোহাম্মদ সোহেল শমীক জানান, ডব্লিউএইচওর হিসাবে প্রতি লাখে আত্মহত্যার হার ২ দশমিক ৮ হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী এই হার ৮ দশমিক ৬৮। এতে স্পষ্ট হয়, আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্র অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

পাঁচ বছরে ৭৩ হাজারের বেশি আত্মহত্যা

পুলিশের উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে মোট ৭৩ হাজার ৫৯৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। গড়ে বছরে ১৪ হাজার ৭১৯ জন এবং দিনে প্রায় ৪০ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১২ হাজার ৩৩৫টি, যা দৈনিক গড়ে ৪১ জনের কাছাকাছি।

কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলেও জানান আশরাফুল ইসলাম।

ফাঁস ও বিষপান সবচেয়ে বেশি

পুলিশের তথ্যে আত্মহত্যার পদ্ধতি হিসেবে ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন দেওয়া, রেললাইনে ঝাঁপ ও অন্যান্য উপায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি ফাঁস, এরপর বিষপান।

মামলার হিসাবে দেখা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যশোর জেলায় আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৫৪টি। এরপর ঢাকা জেলায় ১ হাজার ৪০২টি এবং কুমিল্লায় ১ হাজার ২৮৮টি মামলা হয়েছে।

কৃষির বিষে বাড়ছে ঝুঁকি

অনুষ্ঠানে আত্মহত্যায় কীটনাশক ও আগাছানাশকের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী শফিকুল ইসলাম জানান, দেশে বর্তমানে ৩৪২ ধরনের কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে ঘাসনাশক সবচেয়ে বিপজ্জনক। সরকার ইতোমধ্যে দুটি ঘাসনাশকের আমদানি লাইসেন্স বন্ধ করেছে এবং ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কীটনাশকের সহজলভ্যতা কমানো গেলে আত্মহত্যার হারও কমতে পারে। ভারতের কিছু এলাকায় কমিউনিটি উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের ঘরে কীটনাশক না রেখে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ইতিবাচক ফল দিয়েছে।

অপরাধ নয়, মানসিক সংকট

আলোচকরা বলেন, আত্মহত্যা মূলত মানসিক বিপর্যয়ের ফল। কিন্তু বর্তমান আইনে আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ফলে আত্মহত্যাচেষ্টায় ব্যর্থ ব্যক্তিকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। এতে সামাজিক সম্মানহানি ও আইনি ভয়ের কারণে অনেক ঘটনা গোপন থেকে যায়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, স্বরাষ্ট্র, ধর্ম ও তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নীরব সংকট মোকাবিলা করতে।