১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতি শতাংশ সেচে ডিজেল খরচ ৪০ টাকা, সৌরবিদ্যুতে ২৫ পয়সা

বৈশ্বিক বাজারে ডিজেলের দাম ও সংকটে দেশে কৃষিকাজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। তবে এর প্রভাব পড়েনি বরিশালের কৃষিতে ব্যবহার হওয়া সেচ ব্যবস্থাপনায়। সেচ ব্যয়ের বোঝা কমাতে এ বিভাগে নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে সৌরচালিত পাম্প। বিএডিসি বলছে, ডিজেল ব্যবহার করে সেচ দিতে হলে প্রতি শতাংশে কৃষকের খরচ হয় ৪০ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে সৌরচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিলে ব্যয় হয় মাত্র ২৫ পয়সা।

জানা গেছে, বরিশালের ছয় জেলায় ডিজেলচালিত সেচ স্কিম রয়েছে ৩৪০টি। বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি জেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এ প্রকল্প চালু করেছে। এছাড়া বিভাগের ছয় জেলায় সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্প স্থাপন করা হয়েছে ৪৫টি। বিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প রয়েছে ৩১টি। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় বরিশাল বিভাগের সাত উপজেলায় ইরিগেশন প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্পের অধীনে ৭৮টি পাম্প হাউজ স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বরিশাল সদর উপজেলায় ১৬টি, বাবুগঞ্জে ১৪, বাকেরগঞ্জে ১২, নলছিটিতে ১৪, ঝালকাঠি সদরে ১৪, রাজাপুরে সাত ও কাউখালীতে একটি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থাপিত পাম্পের সক্ষমতা ২৫ কিউসেফ। প্রতি সেকেন্ডে ৭০০ লিটার পানি ওঠাতে সক্ষম একটি পাম্প। এ পাম্প থেকে কৃষকদের মাঝে লোকাল সংগঠনের মাধ্যমে পাম্প হাউজ থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। ডিজেলে নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রতি একক জমিতে সেচ দিতে হলে খরচ হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাউবোর গ্রাভিটি পাম্পের মাধ্যমে দিলে খরচ হয় মাত্র ২ হাজার টাকা।

উপকারভোগী কৃষকরা জানান, সমবায় ভিত্তিতে ২৫ একর জমি নিয়ে কৃষকদের মাঝে একটি কমিটি গঠন করে তাদের মাঝে একটি করে সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্প, ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ১০টি স্ল্যাবের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে দেয় বিএডিসি। প্রতিটি সমিতির কাছ থেকে এককালীন ৩০ হাজার টাকা পাম্পের জন্য এবং বছরে ১৫ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়। প্রকল্পটির একটি পাম্প ও ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করতে সরকারের খরচ হয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৮৪ টাকা। এছাড়া ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। এতে সেচের পানির অপচয় হচ্ছে না। ফলে কৃষকদের পাম্প পরিচালনা ও ফসল উৎপাদন খরচ কমে আসছে।

বাবুগঞ্জের মাধবপাশার চন্দ্রপাড়া সেচ স্কিমের কৃষক ওয়াহেদ। বিএডিসির প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজেলচালিত একটি সেচ স্কিম স্থাপন করেন তিনি। তার স্কিমে ৩০ একর জমিতে ইরি-বোরো চাষ হয়েছে। সময়মতো সেচ দিতে পেরেছেন তিনি। ডিজেলের দামের প্রভাব নেই তার স্কিমে। চৈত্রের আগেই খালে জোয়ারের পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে ডিজেল নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। কৃষক ওয়াহেদ বলেন, ‘এ বছর আমাদের বরিশাল অঞ্চলে পানির সংকট নেই।’ একই কথা বলেন বরিশাল সদর উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান মিরাজ ও সদর উপজেলার চাঁদপুরার কুন্দিয়াল পাড়ার কৃষক নেছার উদ্দিন।

বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়ার খয়েরদিয়া এলাকার সেচ পাম্পের সেচ কমিটির সভাপতি কৃষক নুরুল ইসলাম গাজী বলেন, ‘বছরে আমরা সেচ সুবিধার জন্য যে ১৫ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিচ্ছি, তা একবারেই সামান্য। এর স্থলে ডিজেল বা কেরোসিনচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করলে যে খরচ হতো, তার পরিমাণ এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।’

বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ সিকদার বলেন, স্বল্প খরচে কৃষক ফসল উৎপাদন ও সেচ সুবিধার পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করতে পারছেন। এতে বরিশালের নদী ও খালের পানি ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার একর জমি সেচ সুবিধার আওতায় এসেছে। ফলে ফসল উৎপাদন খরচ কমবে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী (সওকা) প্রকৌশলী সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, ‘আমাদের এখানে সৌরবিদ্যুতের সেচ পাম্প রয়েছে। এ সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্পের মাধ্যমে ফসলের জমিতে সেচ দিলে একরে মাত্র ২৫ টাকা খরচ হয়, যেখানে ডিজেলে খরচ হয় ৪ হাজার টাকা। সেই হিসেবে প্রতি শতাংশে কৃষকের খরচ হয় ৪০ টাকা। আর সৌরচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিলে ব্যয় হয় মাত্র ২৫ পয়সা।

Tag :
About Author Information

Mohon

মায়াবী চিত্রা হরিণটির পা চেপে ধরেছেন একজন, অন্যজন কোপাচ্ছেন দা দিয়ে

প্রতি শতাংশ সেচে ডিজেল খরচ ৪০ টাকা, সৌরবিদ্যুতে ২৫ পয়সা

Update Time : ১১:৩২:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

বৈশ্বিক বাজারে ডিজেলের দাম ও সংকটে দেশে কৃষিকাজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। তবে এর প্রভাব পড়েনি বরিশালের কৃষিতে ব্যবহার হওয়া সেচ ব্যবস্থাপনায়। সেচ ব্যয়ের বোঝা কমাতে এ বিভাগে নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে সৌরচালিত পাম্প। বিএডিসি বলছে, ডিজেল ব্যবহার করে সেচ দিতে হলে প্রতি শতাংশে কৃষকের খরচ হয় ৪০ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে সৌরচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিলে ব্যয় হয় মাত্র ২৫ পয়সা।

জানা গেছে, বরিশালের ছয় জেলায় ডিজেলচালিত সেচ স্কিম রয়েছে ৩৪০টি। বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি জেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এ প্রকল্প চালু করেছে। এছাড়া বিভাগের ছয় জেলায় সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্প স্থাপন করা হয়েছে ৪৫টি। বিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প রয়েছে ৩১টি। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় বরিশাল বিভাগের সাত উপজেলায় ইরিগেশন প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্পের অধীনে ৭৮টি পাম্প হাউজ স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বরিশাল সদর উপজেলায় ১৬টি, বাবুগঞ্জে ১৪, বাকেরগঞ্জে ১২, নলছিটিতে ১৪, ঝালকাঠি সদরে ১৪, রাজাপুরে সাত ও কাউখালীতে একটি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থাপিত পাম্পের সক্ষমতা ২৫ কিউসেফ। প্রতি সেকেন্ডে ৭০০ লিটার পানি ওঠাতে সক্ষম একটি পাম্প। এ পাম্প থেকে কৃষকদের মাঝে লোকাল সংগঠনের মাধ্যমে পাম্প হাউজ থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। ডিজেলে নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রতি একক জমিতে সেচ দিতে হলে খরচ হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাউবোর গ্রাভিটি পাম্পের মাধ্যমে দিলে খরচ হয় মাত্র ২ হাজার টাকা।

উপকারভোগী কৃষকরা জানান, সমবায় ভিত্তিতে ২৫ একর জমি নিয়ে কৃষকদের মাঝে একটি কমিটি গঠন করে তাদের মাঝে একটি করে সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্প, ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ১০টি স্ল্যাবের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে দেয় বিএডিসি। প্রতিটি সমিতির কাছ থেকে এককালীন ৩০ হাজার টাকা পাম্পের জন্য এবং বছরে ১৫ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়। প্রকল্পটির একটি পাম্প ও ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করতে সরকারের খরচ হয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৮৪ টাকা। এছাড়া ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। এতে সেচের পানির অপচয় হচ্ছে না। ফলে কৃষকদের পাম্প পরিচালনা ও ফসল উৎপাদন খরচ কমে আসছে।

বাবুগঞ্জের মাধবপাশার চন্দ্রপাড়া সেচ স্কিমের কৃষক ওয়াহেদ। বিএডিসির প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজেলচালিত একটি সেচ স্কিম স্থাপন করেন তিনি। তার স্কিমে ৩০ একর জমিতে ইরি-বোরো চাষ হয়েছে। সময়মতো সেচ দিতে পেরেছেন তিনি। ডিজেলের দামের প্রভাব নেই তার স্কিমে। চৈত্রের আগেই খালে জোয়ারের পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে ডিজেল নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। কৃষক ওয়াহেদ বলেন, ‘এ বছর আমাদের বরিশাল অঞ্চলে পানির সংকট নেই।’ একই কথা বলেন বরিশাল সদর উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান মিরাজ ও সদর উপজেলার চাঁদপুরার কুন্দিয়াল পাড়ার কৃষক নেছার উদ্দিন।

বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়ার খয়েরদিয়া এলাকার সেচ পাম্পের সেচ কমিটির সভাপতি কৃষক নুরুল ইসলাম গাজী বলেন, ‘বছরে আমরা সেচ সুবিধার জন্য যে ১৫ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দিচ্ছি, তা একবারেই সামান্য। এর স্থলে ডিজেল বা কেরোসিনচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করলে যে খরচ হতো, তার পরিমাণ এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।’

বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ সিকদার বলেন, স্বল্প খরচে কৃষক ফসল উৎপাদন ও সেচ সুবিধার পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করতে পারছেন। এতে বরিশালের নদী ও খালের পানি ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার একর জমি সেচ সুবিধার আওতায় এসেছে। ফলে ফসল উৎপাদন খরচ কমবে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী (সওকা) প্রকৌশলী সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, ‘আমাদের এখানে সৌরবিদ্যুতের সেচ পাম্প রয়েছে। এ সৌরবিদ্যুচ্চালিত পাম্পের মাধ্যমে ফসলের জমিতে সেচ দিলে একরে মাত্র ২৫ টাকা খরচ হয়, যেখানে ডিজেলে খরচ হয় ৪ হাজার টাকা। সেই হিসেবে প্রতি শতাংশে কৃষকের খরচ হয় ৪০ টাকা। আর সৌরচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিলে ব্যয় হয় মাত্র ২৫ পয়সা।