দাড়িপাল্লা ও হাতপাখা—দুই প্রতীকের দুই দলই এবারের নির্বাচনে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন আসনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামান্য সমন্বয় বা কৌশলগত জোট গঠন করা গেলে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু পারস্পরিক অনৈক্য, অবিশ্বাস এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় অনেক আসন হাতছাড়া হয়েছে।
পিরোজপুর-২ আসনে সাঈদী পুত্র অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি ও হেভিওয়েট প্রার্থী গোলাম পরওয়ার প্রায় দুই হাজার ভোটে হেরেছেন। শুধু এই দু’টি নয়—প্রায় ৫৩টি আসনে জামায়াত ৫ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। কিছু আসনে দেখা গেছে, হাতপাখা ও শাপলা কলির ভোট একত্রিত হলে ধানের শীষ পরাজিত হতো। অর্থাৎ সমন্বয়ের অভাবই ছিল বড় ফ্যাক্টর। এমন বহু আসনে দুই দলের ভোট আলাদাভাবে শক্তিশালী উপস্থিতি দেখালেও, বিভক্ত অবস্থানে তারা কার্যত নিজেদের সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
চরমোনাই নেতৃত্বাধীন দলকে যদি জামায়াত কৌশলগতভাবে সঙ্গে রাখতে পারত, তাহলে জোটগত হিসাব অনেক ভিন্ন হতে পারত। অনুমান করা যায়, জামায়াত জোটের আসন সংখ্যা ১২০–এর বেশি হতে পারত এবং হাতপাখাও ২০–এর বেশি আসন পেতে সক্ষম হতো। বহু আসনে হাতপাখা ৩০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছে—যা প্রমাণ করে তাদের ভোটব্যাংক উপেক্ষণীয় নয়। শিশির মনিরের মতো প্রার্থী জয়ী হতে পারতেন, যদি একই আদর্শিক বলয়ের আরেক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না থাকতেন। ফয়জুল করিমও জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারতেন, যদি দাড়িপাল্লার সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা হতো।
অন্যদিকে, বিএনপি কোনো বড় বিনিয়োগ ছাড়াই এই অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছে। হুজুরদের বিভক্ত রাজনীতি তাদের জন্য সহজ জয়ের পথ তৈরি করেছে। জামায়াতের নেতৃত্বের একধরনের ‘মোড়লগিরি’ মনোভাব এবং চরমোনাইয়ের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস—দুই পক্ষেরই কৌশলগত ভুল এই পরিস্থিতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার বড় গুরুত্ব রয়েছে। ০.০১% ভোটের দল বলে বিদ্রুপ করা কিংবা আলোচনায় স্বচ্ছতার অভাব রাখা—এসব আচরণ অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে। এনসিপির সঙ্গে আলোচনা-প্রক্রিয়ায় যদি আরও খোলামেলা অবস্থান নেওয়া হতো, তাহলে সন্দেহ ও বিভক্তি এতটা বাড়ত না। একইভাবে, চরমোনাই যদি অন্তত কিছু আসনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় যেত, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো।
বাস্তবতা হলো—এভাবে একা একা রাজনীতি করা যায় না। রাজনীতিতে চরম বিশুদ্ধবাদিতা বা ‘আমিই একমাত্র সঠিক’ মনোভাব দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়। আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কৌশলও সমান জরুরি। সমঝোতা, সমন্বয় ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া বৃহত্তর রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন কঠিন।
আশা করা যায়, এই রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে সংশ্লিষ্ট দুই দল শিক্ষা নেবে। ভবিষ্যতে পারস্পরিক আস্থা, কৌশলগত সমঝোতা এবং বাস্তববাদী পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হবে। রাজনীতিতে পরাজয় চূড়ান্ত নয়—সঠিক শিক্ষা গ্রহণই হতে পারে পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি।
মোজাম্মেল হোসেন মোহন 
























